ইসলামী শরিয়ত ও ইলমুল কালামের পরিভাষায় কারামত

0
22
views

ইসলামী শরিয়ত ও ইলমুল কালামের পরিভাষায় কারামত

 ইসলামী শরিয়ত ও ইলমুল কালামের পরিভাষায় কারামত 

আক্বায়িদের কিতাব থেকে সংজ্ঞা 

وكرامة ظهور امر خارق للعادة من قبله غير مقارن لدعوى النبوة-

অর্থাৎ আল্লাহর অলীর কারামাত হলো- তাঁর থেকে সাধারণ (মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক) নিয়মের বহির্ভূত কোন আলৌকিক ঘটনা প্রকাশ হওয়া। নবুয়্যতের দাবী করা ব্যতীত।

গ্রন্থ সূত্র :

শরহে আকায়েদে নসফী (আরবী): পৃষ্ঠা ১৪৫।

কারামতের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে ইমাম আল্লামা সা’দ উদ্দীন আত্ তাফযানী (৭২১ হি. ওফাত) বলেন :

الكرامة ظهور امر خارق للعادة من قلبه بلادعوى النبوة وهى جائز ولو بقصد الولى من جنس المعجزات لشمول قدرة الله تعالى واقعة كقصة مريم واصف واصحاب الكهف وتواترجنسه من الصحابة والتابعين وكثير من الصالحين- (شرح المقاصد)

অর্থাৎ : “যে সব কাজ সর্ব সাধারণের জন্য সাধ্যের বাইরে ও স্বভাবের বিপরীত তথা অলৌকিক।

এ জাতীয় কোন ঘটনা আল্লাহর কোন প্রকৃত অলী থেকে যদি নবুয়্যতের দাবী ব্যতিরেকে প্রকাশিত হয়, তাকে কারামত বলে, কারামত বৈধ/ জায়েয, যদিও তা অলীর ইচ্ছায় ও চাহিদায় প্রকাশ পায়।

যদি তা নবী-রাসূলগণের মুজিযা জাতীয়ও হয়।

কেননা এতে আল্লাহর কুদরত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কারণ কারামত দ্বীন ইসলামের স্বার্থে খোদা প্রদত্ত শক্তি বলে প্রকাশিত হয় বিধায় একে অস্বীকার করা আল্লাহর কুদরতকে অস্বীকার করার নামান্তর।

কারামত ক্বুরআনুল কারিমেও বর্ণিত রয়েছে, যেমন হযরত মরিয়ম আলায়হাস্ সালাম, হযরত আসেফ ইবনে বরখিয়া এবং আসহাবে কাহাফের ঘটনা।

তাছাড়া সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে এজাম এবং অগণিত সালেহীন থেকে ধারাবাহিকভাবে কারামত প্রকাশ হয়েছে।

গ্রন্থ সূত্র :

শরহুল মাকাসিদ কৃত: ইমাম আল্লামা সা’দ উদ্দীন তাফতাযানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, পৃষ্ঠা ২০৩।

ইমাম আল্লামা নাসফী তাঁর ‘আকায়েদে নসফী ‘গ্রন্থে কারামত প্রসঙ্গে বলেন, كرامة الاولياء حق অর্থাৎ আউলিয়াহ কেরাম থেকে প্রকাশিত কারামত হক তথা সত্য।

 নবীগণের মুযেযাত ও আউলিয়া কেরামের আল্লাহ্ প্রদত্ত অলৌকিক নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর আল্ ফিক্হুল আকবর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : 

قال ابوحنيفة رحمة الله عليه والايات للانبياء والكراماتُ للاولياءِ حَقٌّ- الخ (الفقه الاكبر للامام الاعظم ابى حنيفه رحمه الله عليه)

অর্থাৎ ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ‘আম্বিয়ায়ে কেরামের মুযেযা এবং আউলিয়ায়ে কেরামের কারামত সত্য।

গ্রন্থ সূত্র :

_ আল্ ফিকহুল আকবর।

 এ কথার সূত্র ধরে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর রচিত ‘শরহুল ফিকহিল আকবর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :

الكرامات للاولياء حَقٌّ اى ثابت بالكتاب والسنة-

অর্থাৎ আউলিয়ায়ে এজামের কারামত সত্য অর্থাৎ পবিত্র ক্বোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

তাই আল্লামা সা’দ উদ্দীন তাফতাযানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি কারামতে আউলিয়া সমূহকে আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ বলে একে বিশ্বাস করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি ক্বুরআনুল করীম দ্বারা কারামতে আউলিয়া হক-সত্য প্রমাণ করতে গিয়ে ক্বোরআনে বর্ণিত কারামত যেমন সূরা আলে ইমরানের ৩৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত ‘হযরত মরিয়ম আলায়হাস্ সালাম’র নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে বে-মওসুমী ফল আসার ঘটনা এবং সূরা মরয়মের ২৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত ‘হাতের স্পর্শে মৃত ও শুষ্ক খেজুর গাছ মুহুর্তে জীবন্ত ও তাজা ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়ে পরিপক্ষ খেজুর দান করার অলৌকিক ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করেন।

এভাবে সূরা নামলের ৪০ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হযরত আসেফ বিন বরখিয়া কর্তৃক মুহুর্তের মধ্যে সহস্র মাইল দূর থেকে রাণী বিলকিসের বিরাট সিংহাসন ইয়ামেন থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস নিয়ে আসা, হযরত খিজির আলায়হিস্ সালামের ঘটনা, সূরা কাহফে বর্ণিত ‘আসহাবে কাহাফের আশ্চর্যজনক অলৌকিক ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যা সত্য ও হক এবং বিশ্বাস করা ঈমানের দাবী।

তদ্রুপ পীরানে পীর দস্তগীর বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর বহু অলৌকিক ঘটনা রয়েছে।

তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কারামত ‘মাতৃগর্ভে থাকাকালীন’ খোদা প্রদত্ত অলৌকিক ক্ষমতা বলে ব্যাঘ্ররূপ ধারণ করে এক ভণ্ড ফকিরকে হত্যা করে মায়ের ইজ্জত আবরু রক্ষা করছিলেন।

এভাবে

০১. মায়ের গর্ভে ১৮ পারা ক্বোরআন মুখস্থ করা,

০২. মৃত ও ডুবন্ত জাহাজকে বরযাত্রীসহ ১২ বৎসর পর সমুদ্র হতে জীবিত তুলে আনা,

০৩. আহারের পর মৃত মুরগীর হাড়কে জীবিতকরণ,

০৪. মুছিবতে মুরিদ-ভক্তকে সাগরে ডুবে যাওয়া হতে উদ্ধারকরণ,

০৫. একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হওয়া,

০৬. মনের কথা জানা,

০৭. চোরকে “আবদাল” বানিয়ে দেয়া সহ অগণিত কারামত প্রকাশিত হয়েছে যা প্রকৃত অর্থে কুদরতে ইলাহীর বহিঃপ্রকাশ।

আউলিয়ায়ে কেরামের কারামতকে সত্য/হক বলে জানা প্রকৃত পক্ষে ক্বুরআন ও আল্লাহর কুদরতকে মান্য করা, আর অস্বীকার করা বস্তুত ক্বুরআন ও কুদরতে ইলাহীকে অস্বীকার করা, আর ক্বোরআন এবং কুদরতে ইলাহীকে অস্বীকার করা কুফরী এবং গোমরাহী।

তবে আউলিয়ায়ে কেরামের কোন নির্দিষ্ট কেরামত অস্বীকারকারী বেঈমান ও কাফেরের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তার অস্বীকার করাটা গোমরাহী থেকে খালি নয়।

এ ধনেরর ব্যক্তি মৃত্যুর সময় ও কবরে, হাশরে তথা পরকালে হুযূর গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সহ আউলিয়ায়ে কেরামের দয়া ও সুপারিশ হতে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা বেশী।

তদুপরি বেয়াদবির উদ্দেশ্যে যদি হযরত গাউসে পাক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র কেরামত ও আল্লাহর প্রদত্ত বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতাকে অস্বীকার/ঠাট্টা বিদ্রোপ করে তবে আল্লাহর গজবে পতিত হয়ে ঈমান হারা হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা আছে।

বেয়াদবীর কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে পীরানে পীর দস্তগীরের বদ নজরে উভয় জাহানের ধ্বংস ও বরবাদ হওয়ার অনেক ঘটনা ‘বাহজাতুল আসরার’ কৃত ইমাম শতনূফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও ‘মাজহারে জামালে মোস্তাফায়ী কৃত আল্লামা সৈয়দ নাছির উদ্দীন রহমাতুল্লাহি আলায়হি সহ গাউসে পাকের শানে রচিত অনেক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থ সমূহে বর্ণনা করা হয়েছে।

স্বাভাবিক রীতির উল্টো কাজ প্রকাশ করার ক্ষমতা আল্লাহ তায়া’লার রয়েছে, এটা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এটাই আমাদের ঈমান।

আল্লাহ তায়ালা যেমন বাতাসের উপর ভর করে হযরত সুলাইমান আঃ কে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করার সুযোগ দিয়েছেন, তেমনি নবী না হলেও হযরত বিবি মরিয়মকে স্বামী সঙ্গ ছাড়াই তাঁর পেটে সন্তান দিয়েছেন।

ঈসা ইবনূ মারইয়াম আঃ এঁর হাতে মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালাই।

সাপকে লাঠিতে পরিণত করেছেন মুসা আঃ এঁর হাতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই।

সেই আল্লাহ তায়ালাই হযরত ওমর রাঃ এর সামনে সুদূরে থাকা জিহাদরত মুজাহিদ বাহিনীর অবস্থা পরিস্কার করে দিলেন, ফলে তিনি মদীনার মসজিদে জুমআর খুতবাদানকালেও যুদ্ধরত মুজাহিদদের সতর্ক করে বললেন-

 يَا سَارَيَةُ ! الْجَبَلَ

অর্থাৎ হে সারিয়া! পাহাড়!

এই কথা শুনে সুদূরে যুদ্ধরত মুজাহিদরা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে সেই যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন।

 গ্রন্থ সূত্র :

_ কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফআল, হাদীস নং ৩৫৭৮৮, ৩৫৭৮৯।

তেমনি বুযুর্গানে দ্বীন থেকে আল্লাহ তায়ালা নিজেই আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যে মাঝে মাঝে আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ করেন।

যেমন,

নবী পাগল কোন বুযুর্গ মদীনায় গিয়ে নবীর রওজায় হাত বাড়িয়ে বাস্তবে (স্বপ্নযোগে নয়) মুসাফাহা করেছেন।

ঘুমের মাঝে প্রিয় নাবী রাসূলুন কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم)  এঁর দেয়া রুটি খেতে খেতে ঘুম থেকে জেগে হাতে অর্ধেক রুটি পেয়েছেন কোন কোন নবীর আশেকীন।

এই সকল ঘটনা স্বাভাবিক রীতি বিরুদ্ধ। যা আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরাতে প্রকাশ করেছেন।

এসব উপকারী বিষয় সংশ্লিষ্ট বুযুর্গ আল্লাহর হাতে নিজেকে সোপর্দ করার কারনে তাঁদের দ্বারা ঘটিয়ে অাল্লাহ্ পাক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপকৃত করেছেন।

পক্ষান্তরে

আউলিয়ায়ে ক্বিরাম রা. এঁর সাথে তাঁদের ওফাতের পূর্বে-পরে বেয়াদবি করার কারনে গযবে ইলাহীতে নিপতিত হয়েছে। আল্লাহ্ ক্ষমা করুন।

এসব বিষয়কে শিরক বলাটা দ্বীন সম্পর্কে আর শিরকের সংজ্ঞা সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক।

নবীদের মুজিজা, আর বুযুর্গদের কারামাত আল্লাহ তায়ালার কুদরত। আল্লাহ্ তায়ালার কুদরতকে অস্বিকারী জাহিল কিংবা পাগল নয়ত বেঈমান; যদিও সে নামাযী হয়।

তিনি ইচ্ছে করলেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেন। যেটা থেকে যা হওয়া সম্ভব নয়, তা থেকে তা করে দেখানোর ক্ষমতা আল্লাহর আছে, এটা আমাদের ঈমান।

আল্লাহ তায়ালা অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখেন-এই বিশ্বাস ভূঁয়া আহলে হাদিস ওহহাবীরা আল্লাহর প্রতি রাখে না বলেই পরিদৃষ্ট হচ্ছে।

মনে হচ্ছে, তারা আল্লাহ তায়ালাকে তাদের মতই দুর্বল আর কমজোর মনে করে।

তা না হলে বুযুর্গানে দ্বীন থেকে প্রকাশিত আশ্চর্য ঘটনা সম্বলিত কারামাতকে তারা অস্বিকার করার যৌক্তিকতা নেই।

আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করে মানুষের মাঝে ঈমান উদ্দীপ্ত করার প্রতি প্রিয় নাবী রাসূলুন কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم)  নিজেই উদ্ভুদ্ধ করেছেন।

দেখুন, প্রিয় নাবী রাসূলুন কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم)  ইরশাদ করেন :

 عن عبد الله بن عمرو  : أن النبي صلى الله عليه و سلم قال بلغوا عني ولو آية وحدثوا عن بني إسرائيل ولا حرج (صحيح البخارى، كتاب الانبياء، باب ما ذكر عن بني إسرائيل، رقم الحديث-3274

অর্থাৎ : “হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত।

প্রিয় নাবী রাসূলুন কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم)  ইরশাদ করেছেন যে, “আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও পৌঁছে দাও। আর বনী ইসরাঈলের বিষয় (তাদের মাঝে সংঘঠিত ঘটনাদি) বর্ণনা করো, কোন সমস্যা নেই”।

 গ্রন্থ সূত্র :

_ সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩২৭৪;

_ সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৬২৫৬;

_ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৬৬৪;

_ সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৫৮৪৮।

বনী ইসরাঈল হলো হযরত মুসা আঃ ও হযরত ঈসা আঃ এর উম্মত বা জাতি।

যদি হযরত মুসা আঃ ও ঈসা আঃ এর জাতির ঘটনা বর্ণনা করাতে কোন সমস্যা না থাকে, তাহলে শ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম উম্মত, উম্মতে মুহাম্মদীর বুযুর্গানে দ্বীনের ঈমানদীপ্ত ঘটনা বর্ণনা করায় শিরক বা দোষণীয় হওয়ার কোনোই অবকাশ থাকে না।

তাহলে কি ভূঁয়া সালাফী ওহহাবীদের মতে উম্মতে মুহাম্মদীর চেয়ে বনী ইসরাঈলরা বেশি মর্যাদার অধিকারী? বা বেশি শ্রেষ্ঠ? বা বেশি বুযুর্গ?

আসলে ভূঁয়া লা মাযহাবী গায়রে মুকাল্লিদ গোষ্ঠি “আহলে হাদীস” নামটি রানী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে রেজিষ্টার করিয়েছে কেবল মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় বিভক্তি আর কোন্দল সৃষ্টি করার জন্যই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here