গীবত একটি কবীরা গোনাহ

0
18
views

অন্যের কাছে কারো দোষ চর্চা করাকে গীবত বলে যা উক্ত ব্যক্তি শুনতে লজ্জাবোধ করে। মানুষের স্বভাব হচ্ছে, দুজন একত্র হলে গল্পগুজবে জড়িয়ে যায়। যার বিরাট এক অংশ থাকে অপরের খারাপ দিক গুলোর আলোচনা।
ভুল ধারণা: অনেকে গীবত করে একথা বলে থাকে যে, আমি এ কথা তার সামনেও বলতে পারব। একথার দ্বারা মূলত গীবতের বৈধতার স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সামনে বলে কষ্ট দেওয়াটাও গীবতের মতো কবীরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, তা হচ্ছে মুসলমান ভাইকে কষ্ট দেওয়া। আর তার অনুপস্থিতিতে বললে তো গীবতই। (রুহুল মাআনী, সূরা হুজুরাত: ১২)
কেউ কেউ মনে করে যে, আমি তো বাস্তব কথাই বলছি। যারা এরূপ ধারণা নিয়ে কারো দোষের প্রকাশ করেন, তারাই গীবত করেন। কারণ, বাস্তব হলেই তা গীবত হয়। আর বাস্তব না হলে তা হবে অপবাদ। যা গীবতের চেয়েও মারাত্মক গোনাহ। হাদীসে পাকে তাকে হারাম ও কবীরা গোনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে, এ কথাও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাউকে অপবাদ দিবে সে মৃত্যুর আগে হলেও ওই অপরাধে লিপ্ত হয়ে যাবে।

গীবতের প্রকার
১.কারো দৈহিক দোষের কথা আলোচনা করা। যেমন-কাউকে ল্যাংড়া, কুশ্রী, বেটে-খাটো ইত্যাদি বলে সম্বধোন করা।
২.কারো পোশাক-পরিচ্ছদের দোষ সম্পর্কে আলোচনা করা। যেমন- কারো ব্যাপারে বলা যে, অমুককে এই পোশাকে একটুও মানাচ্ছে না। বা তার পোশাকটা সুন্নতি নয়।
৩.নিজের মর্যাদা বাড়িয়ে বলে অপর কারো মর্যাদাকে ক্ষুণœ করে কথা বলা। বা কারো বংশ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা।
৪.অভ্যাস ও চালচলন সম্পর্কীয় দোষ নিয়ে কথা বলা। যেমন-এভাবে বলা, সে খাওয়ার সময় আওয়াজ করে খায়। বা ঘুমিয়ে বিকট আওয়াজে নাক ডাকে।
৫.গোনাহ সম্পর্কে পরসমালোচনা করা। যেমন-কারো সম্পর্কে বলা, সে মিথ্যুক, সুদখোর, ঘুষখোর।

মুসলমানের সম্মানহানি করা হারাম
বিদায় হজের ভাষণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত, তোমাদের উপর হারাম যেমন তোমাদের এই শহরে এই মাসের এই দিনটি হারাম। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা মুসলমানদের গীবত করো না। তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা, যে তার ভাইয়ের দোষ অন্বেষণ করে বেড়ায় আল্লাহও তার দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করেন না। আর আল্লাহ তা’আলা যার দোষ মার্জনা না করেন, তাকে তিনি ঘরের ভিতর রেখেও লাঞ্ছিত করতে পারেন। (তাফসীরে ইবনে কাছীর, সূরা হুজুরাত ১২)

একজন মুসলমান কাবা ঘরের চেয়েও মূল্যবান
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাবা শরীফের তাওয়াফরত অবস্থায় বলতে শুনেছি, হে কাবা! কত প্রিয় তুমি এবং তোমার সুগন্ধি! তুমি এবং তোমার মর্যাদা কত উচ্চ! ঐ সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! মুমিনের মর্যাদা এবং তার রক্ত ও সম্পদ আল্লাহর নিকট তোমার চেয়েও মহান। আর তার প্রতি যেন কেবলই ভাল ধারণা পোষণ করা হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৯৩২)
এ কথা বলার অপেক্ষা থাকে না যে, গীবত করে কোনো মুসলমানের মর্যাদার উপর হামলা করা কাবা শরীফের উপর হামলা করার চেয়েও সাংঘাতিক মন্দ কাজ! পক্ষান্তরে কাবা শরীফের উপর হামলার ইচ্ছা করা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করারই নামান্তর। সুতরাং তার পরিণাম হাতির মালিক আবরাহার চেয়ে ভালো কিছু ভাবাই যায় না।

গীবতের ভয়াবহ পরিণাম
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন আমাকে মেরাজের রাত্রিতে বেহেশত-দোযখ ভ্রমণ করানো হয়, তখন এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে আমি অতিক্রম করি, যারা তাদের নখ দিয়ে তাদের মুখ ও বুকে প্রচ-ভাবে আঁচড় কাটছিল। আমি জিজ্ঞাসা করি, এরা কারা? জিবরাঈল আ. বললেন, এরা হল তারা যারা মানুষের গোশত ভক্ষণ করত অর্থাৎ গীবত করত এবং অন্যের সম্মানহানি করে তাদের হক নষ্ট করত।

গীবত যিনার চেয়েও ঘৃণ্য
হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, গীবত করা ব্যভিচার করার চেয়েও ঘৃণ্য কাজ। (শুয়াবুল ইমান, বায়হাকী শরীফ, হাদীস নং ৬৩১৫)
অজ্ঞতাবশত আলেমদের দোষচর্চা করাও গীবত: কোনো সাধারণ মুসলমানের গীবত করার ভয়াবহতাই গীবত থেকে বারণ করতে যথে।” তদুপরি কোনো আল্লাহর ওলী-বুযুর্গ বা আলেম-ওলামা শ্রেণীর গীবত করা আরো অধিক ভয়াবহ। কেননা, হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৫০২)

গীবত থেকে তাওবা করার নিয়ম
যে কোনো গোনাহ থেকেই তওবার জন্যে শর্ত তিনটি-
১. গোনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কচ্ছিন্ন করা।
২. অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে ওই গোনাহ পুনরায় না করার সংকল্প করা। (রিয়াযুস সালেহীন)
গীবত থেকে তওবার চতুর্থ একটি শর্ত রয়েছে। আর তা হচ্ছে, যার গীবত করা হয়েছে, তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।
(শুয়াবুল ইমান, বায়হাকী, হাদীস নং-৬৩১৫)

গীবত থেকে বাঁচার উপায়
হযরত থানভী রহ. বলেন, গীবতের রোগ দূর করার জন্যে তিনটি কাজ করবে।
১. গীবতের ভয়াবহতাকে স্মরণ করবে।
২. গীবত না করার হিম্মত করবে।
৩. গীবত হয়ে গেলে যার সম্পর্কে হয়েছে, তার থেকে মাফ চেয়ে নিবে। বিশেষত এই শেষোক্ত পন্থা। অর্থাৎ, গীবত হয়ে গেলে সাথে সাথে তাকে জানিয়ে দিবে। ইনশাআল্লাহ, গীবত করার রোগ দূর হয়ে যাবে। (বাসায়েরে হাকীমুল উম্মত থেকে আউনুত তিরমিযী: ১/২২৯)
আমার কাছে আরো একটি উপায়ে গীবত থেকে বেঁচে যাওয়ার কথা খেয়াল হয়, তা হচ্ছে গীবতের মজলিস বা কথায় কথায় যারা অন্যের দোষচর্চা করে তাদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকা।

এগুলো গীবত নয়
১. হাদীসের মান নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বর্ণনাকারীর ভাল-মন্দ পর্যালোচনা করা।
২. যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে গোনাহ করে তার ঐ গোনাহ নিয়ে আলোচনা করা।
৩. বিবাহ ইত্যাদির প্রয়োজনে কারো দোষ-গুণ বলে দেওয়া।
৪. জালেমের জুলুমের কথা প্রকাশ করা।
৫. কারো অনিষ্ট থেকে অন্যদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তার জুলুম ইত্যাদির কথা বলে দেওয়া।
৬. কারো অপরাধ সংশোধনের আশায় তার অভিভাবকের কিংবা বিচারকের নিকট প্রকাশ করে দেওয়া।
৭. শাসক বা দায়িত্বশীলদের দায়িত্বাবহেলার কথা সমালোচনা করা। ইত্যাদি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here