বিষয়ঃ- ১০ই মহররম মাতম করে শরীর থেকে রক্ত ঝড়ানো বন্দেগী না নাফরমানী?

0
15
views

১০ই মুহাররম মাতম করে শরীর থেকে রক্ত ঝড়ানো পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিষেধ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য কারার নাম বন্দেগী না নাফরমানী?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের উপর নিপিড়ন করতে, নিজের উপর জুলুম করতে নিষেধ করেছেন। ঘোষণা দিয়েছেন-

فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ ۚ [٩:٣٦

সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। {সূরা তওবা-৩৬}

নিজের উপর জুলুম করাকে নিষিদ্ধ করেছেন আল্লাহ তাআলা। এটি আমাদের নির্দেষ নয়। আল্লাহ পাকের নির্দেশ। কারণ আমাদের প্রাণের মূল মালিকানা আমাদের নয়। এর মূল মালিকানা আল্লাহ পাকের। আমাদের প্রাণ আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ [٩:١١١

আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। {সূরা তাওবা-১১১}

যেহেতু আল্লাহ পাক আমাদের প্রাণকে কিনে নিয়েছেন। তাই আমাদের প্রাণের প্রকৃত মালিক আমরা নই। কেবল ভোগ দখলের মালিক। তাই এ প্রাণকে যথেচ্ছাভাবে ব্যবহারের কোন অধিকার কোন মানুষের নেই। এ প্রাণকে কষ্ট দেয়া। আঘাত করার কোন অধিকার কোন মানুষের নেই। কেউ যদি সেই প্রাণকে ইচ্ছেকৃত কষ্ট দেয়, ক্ষত-বিক্ষত করে নিজে নিজে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পবিত্র আমানতকে নষ্ট করল।

কোন ব্যক্তির আমানত যে নষ্ট করে, সে যেমন বে-ঈমান। সেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আমানত বিনষ্টকারী কি করে মুমিন থাকতে পারে? উক্ত ব্যক্তিতো আরো বড় বে-ঈমান।

সুতরাং মাতম করে, নিজের শরীরে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষতকারী কিছুতেই মুমিন থাকতে পারে না। যেখানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনে স্পষ্ট নির্দেশ যে, মুহররমের পবিত্র মাসে নিজের উপর আঘাত করা যাবে না, জুলুম করা যাবে না সেখানে নিজেকে আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পবিত্র আমানত যে ব্যক্তি নষ্ট করবে উক্ত ব্যক্তি ঈমানহারা হয়ে যায়। প্রকাশ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশ লঙ্ঘন করে আল্লাহর আমানত বিনষ্টকারী কিছুতেই ঈমানদার হতে পারে না।

রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) এর নির্দেশ অমান্যের নাম বন্দেগী নয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কালামুল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন-

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [٥٩:٧

রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। {সূরা হাশর-৭}

মাতম করা, শোকতাপে নিজেকে আঘাত করতে রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) নিষেধ করেছেন। রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) এর সেসব নিষেধ অমান্য করার নাম নাফরমানী, বন্দেগীও ইবাদত নয়। রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) একাধিক হাদীসে মাতম করতে, মর্সিয়া করতে, শোকে নিজেকে আঘাত করতে নিষেধ করেছেন। যেমন-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا)থেকে বর্ণিত। রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) ইরশাদ করেছেন, সে ব্যক্তি আমাদের দলের লোক নয়, যে [মৃতের শোকে] নিজ মুখমন্ডলে হাত দ্বারা আঘাত করে, জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং অন্ধকার যুগের লোকদের মত হা-হুতাশ করে। {মুসন্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১১৩৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৩৬৫৮, সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১২৯৭, ১২৩৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৬৫, ১০৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৫৮৪}

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَنَا بَرِيءٌ مِمَّنْ حَلَقَ وَسَلَقَ وَخَرَقَ»

হযরত আবু বুরদা ইবনে মুসা (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا) হতে বর্ণিত। রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) ইরশাদ করেছেন, আমার সাথে ঐ ব্যক্তির সম্পর্ক নেই, যে মাথা কেশ ছিন্ন করে, উচ্চস্বরে বিলাপ করে এবং জামা ছিঁড়ে ফেলে। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০৪, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৫৮৬, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-১৮৬৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৬১৭}

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ: «لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّائِحَةَ وَالْمُسْتَمِعَةَ»

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) বিলাপকারিণীকে এবং তা শ্রবণকারীকে অভিসম্পাত করেছেন। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১১৬২২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩১২৮, সুনানে সগীর লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১১৪২}

عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: «أَخَذَ عَلَيْنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عِنْدَ البَيْعَةِ أَنْ لاَ نَنُوحَ»،

হযরত উম্মে আতীয়া ( رَضِيَ اللهُ عَنهَا)থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ)আমাদের বাইয়াত গ্রহণকালে এ অঙ্গিকার নিয়েছেন যে, আমরা যেন মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চসরে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রন্দন না করি। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৩০৬, ১২৪৪}

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ: الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ، وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ “

হযরত আবু হুরাইরা (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) বলেছেনঃ “দুটি বিষয় এমন যা মানুষের মধ্যে কুফরী বলে গণ্য হয় : বংশধারা কে কলংকিত করা ও মৃত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশার্থে উচ্চ শব্দে কান্নাকাটি করা। {মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-১০৪৩৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১২১, ৬৭}

এরকম আরো অসংখ্য হাদীস রয়েছে যা স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করছে যে, উচ্চস্বরে বিলাপ করা, শোকে কাতর হয়ে নিজের জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি নিষেধ। এসব করতে রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) স্পষ্ট ভাষায় নিষেধ করেছেন।

আর ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলাও বিপদে ধৈর্যধারণের আদেশ দিয়েছেন। সেখানে ধৈর্য না ধরে রসূল ( صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ) এর এতগুলো বিশুদ্ধ বর্ণনাকে পায়ে দলে মাতম করা, চিল্লাফাল্লা করা, নিজেকে বিক্ষত করা কিছুতেই ইবাদত হতে পারে না নাফরমানী ছাড়া।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের কুরআন ও হাদীস বিরোধী এ জঘন্য প্রথা থেকে হিফাযত করুন। হযরত হুসাইন (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا) এর মত সত্য দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হাসিমুখে বাতিলের হাতে শহীদ হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here