বিষয়- ইমাম মুসলিম রাদিয়াল্লাহু আনহু র ঘটনা

0
15
views

ইবনে যিয়াদ বলল- যারা এ মুহূর্তে গভর্নর ভবন ঘেরাও করে রেখেছে, তারা হয়তো আপনাদের ছেলে হবে বা ভাই হবে বা অন্য আত্মীয় স্বজন হবে। আমি এখন আপনাদেরকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর উঠাচ্ছি, আপনারা নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডেকে বুঝান, যেন তারা ঘেরাও প্রত্যাহার করে নেয় এবং হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ত্যাগ করে। যদি আপনারা এই রকম না করেন, তাহলে সবার আগে আপনাদের হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং অতি সহসা আমার যে সৈন্য বাহিনী আসছে তারা কূফা আক্রমণ করবে, আপনাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং আপনাদের শিশুদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠানো হবে অর্থাৎ আপনাদের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। তাই আমি আপনাদেরকে বলছি- আমার পক্ষ অবলম্বন করুন, যদি নিজের এবং পরিবার পরিজনের মঙ্গল চান।

এভাবে যখন সে হুমকি দিল তখন বড় বড় সর্দারেরা ঘাবড়িয়ে গেল এবং সবাই বলতে লাগল, ইবনে যিয়াদ! আপনি যা করতে বলেন আমরা তাই করবো। ইবনে যিয়াদ বললো, চলুন, ছাদে উঠুন এবং আমি যেভাবে বলি সেভাবে করুন। সর্দারেরা সাথে সাথে ছাদের উপর উঠলো এবং নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডাকতে লাগলো। ডেকে চুপি চুপি বুঝাতে লাগলো, দেখ, ক্ষমতা এখন ইয়াযীদের হাতে, সৈন্য বাহিনী ইয়াযীদের হাতে, অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পদ ইয়াযীদের হাতে। হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অবশ্যই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর। কিন্তু তাঁর কাছে না আছে রাজত্ব, না আছে সম্পদ, না সৈন্য-সামন্ত, না অস্ত্র-শস্ত্র। তাই তিনি সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্র ও ধন সম্পদ ব্যতিরেকে কিভাবে ইয়াযীদের মোকাবিলা করবেন? মাঝখানে আমরা বিপদগ্রস্ত হবো। এটা রাজনৈতিক ব্যাপার। তাই তোমরা এখন এ ঘেরাও উঠিয়ে নাও এবং হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দাও। স্মরণ রেখ, তোমরা যদি এরকম না করো, তাহলে না তোমরা আমাদের মুখ দেখবে আর না আমরা তোমাদের মুখ দেখবো। আমাদেরকে এখনি কতল করে ফেলবে আর তোমাদের পরিণামও খুব ভয়াবহ হবে।

যখন বড় বড় সর্দারেরা নিজ নিজ আপন জনদেরকে বুঝাতে ও পরামর্শ দিতে লাগলো, তখন লোকেরা অবরোধ ছেড়ে দিয়ে নীরবে চলে যেতে লাগলো। দশ-বিশজন করে এদিক-ওদিক থেকে লোক চলে যেতে লাগলো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলেন কিন্তু আসরের পর মাগরিবের আগে মাত্র পাঁচশ জন লোক ছাড়া বাকী সব চলে গেল। এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি ভাবলেন, চল্লিশ হাজার লোক থেকে সাড়ে ঊনচল্লিশ হাজার চলে গেছে, কেবল পাঁচশ জন রয়ে গেল, তাদের উপরও বা কতটুকু আস্থা রাখা যায়? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন এ অবস্থা দেখলেন, তখন যে পাঁচশ জন ছিল, তিনি তাদেরকে বললেন, চলুন আমরা জামে মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামায আদায় করি। নামাযের পর পরামর্শ করব- কি করা যায়? সবাই বললেন, ঠিক আছে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পাঁচশ লোককে নিয়ে মসজিদে গেলেন। তখন নামাযের সময় হয়ে গেছে। আযান হয়েছে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। পাঁচশ জন পিছনে ইক্তিদা করলো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিন রাকায়াত ফরয নামায পড়ার পর যখন সালাম ফিরালেন, তখন দেখলেন, ঐ পাঁচশ জনের মধ্যে একজনও নেই।আশ্চর্য! সকালে চল্লিশ হাজার লোক সাথে ছিল, এখন মাগরিবের পরে একজনও নেই! এরা তারাই, যারা নিজেদেরকে আহ্লে বাইত-এর একান্ত ভক্ত বলে দাবি করতো, যাদের পূর্ব পুরুষেরা আহ্লে বাইত-এর অনুসারী দাবীদার ছিল। এরাই চিঠি লিখেছিল, এরাই হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে কূফায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল, এরাই জান-মাল কুরবানীর জন্য নিশ্চয়তা দিয়েছিল! এরাই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং বড় বড় শপথ করে ওয়াদা করেছিল যে, তারা জান দেবে তবুও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করবে না। কিন্তু তাদের প্রাণও দিতে হলো না, তীর দ্বারা আহতও হতে হলো না, না তরবারি দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হলো, কেবল ইবনে জিয়াদের ধমকেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দিল এবং বিশ্বাসঘাতকতা করলো!
হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি নামায শেষে আল্লাহ পাককে স্মরণ করছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন, এখন কী করা যায়? সব লোকতো আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আর এদিকে আমিতো হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে চিঠি লিখে দিয়েছি যে, এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। এখানকার লোকদের মনে তাঁর প্রতি আন্তরিক ও অসীম মুহব্বত রয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না। তিনি খুব তাড়াতাড়ি এসে যাবেন। তখন কী যে প্রতিক্রিয়া হবে, যখন এসে দেখবেন এসব লোকেরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এসব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজ মুরীদের কাছে গেলেন। কিন্তু যেই মুরীদের কাছেই গেলেন, দেখলেন যে, ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি করার পরও ঘরের দরজা খুলছে না। অথচ এরাই ঐসব লোক, যারা বড় বড় ওয়াদা করেছিল এবং আহ্লে বাইত-এর ভক্ত বলে দাবি করেছিল, এখন তারা ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখলো!

হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি রাত্রে কুফার রাস্তায় এমনভাবে অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন যেমন একজন সহায়-সম্বলহীন মুছাফির ঘুরাফিরা করে। তিনি বড় পেরেশানীর সাথে অলি-গলিতে হাঁটতে লাগলেন। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলেন, যিনি ঘরের দরজা খুলে বসেছিলেন। তিনি তার কাছে গিয়ে পানি চাইলেন। বৃদ্ধা পানি দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন এবং কোথায় যাবেন? যখন বৃদ্ধা মহিলাটি তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি অকপটে বললেন, ওহে বোন! আমি মুসলিম বিন আক্বীল, হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতিনিধি হয়ে কূফায় এসেছিলাম। মহিলাটি আশ্চর্য হয়ে বললেন, আপনি মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এভাবে অসহায়ভাবে ঘুরাফিরা করছেন! কূফার সবাই জানে যে, আপনার হাতে হাজার হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং সবাই আপনার জন্য জান-মাল কুরবান করতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন আমি কী দেখছি! আপনি যে এভাবে অসহায়, একাকী ঘুরাফিরা করছেন? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘হ্যাঁ বোন’! বাস্তবিকই তা ছিল। কিন্তু তারা আমার সাথে বেঈমানী করেছে। তাই আপনি আমাকে এই অবস্থায় দেখছেন। কূফার কোন ঘরের দরজা আজ আমার জন্য খোলা নেই, এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি রাত্রি যাপন করতে পারি এবং আশ্রয় নিতে পারি। বৃদ্ধা মহিলা বললেন, আমার গরীবালয় আপনার জন্য খোলা আছে। আমার জন্য এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কি হতে পারে যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একজন আওলাদ আমার ঘরে মেহমান হয়েছেন। সেই বৃদ্ধাটি উনাকে ঘরে জায়গা দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তার ঘরে আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিনি রাত যাপন করলেন
।খোদা তায়ালার কুদরত! ঐ বৃদ্ধার এক ছেলে ছিল বড় নাফরমান। এটা খোদা তায়ালারই শান যে, নেককার থেকে বদকার এবং বদকার থেকে নেককার পয়দা হয়। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের ঘরে কাফির সৃষ্টি করে দেন এবং কাফিরদের ঘরে মু’মিন। ফিরআউনের স্ত্রী শ্রেষ্ঠ ঈমানদার। আর হযরত লূত আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী হয়ে যায় কাফির। কাফিরের ঘরে লালিত-পালিত হয়ে যান নবী-রসূল। আর হযরত নূহ আলাইহিস সালাম-এর ঘরে জন্ম ও লালিত-পালিত কেনান হয়ে যায় কাফির। বৃদ্ধা মহিলার ক্ষেত্রেও তাই। তিনি নেককার। কিন্তু তার ঘরেই জন্ম নিয়েছে এক বড় নাফরমান।

শেষ রাতে বৃদ্ধার সেই নাফরমান ছেলে ঘরে আসলো, এসে মাকে পেরেশান দেখে জিজ্ঞাসা করলো, মা তুমি চিন্তিত কেন? মা বললেন, বৎস! মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি আমাদের প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খানদানের একজন। তিনি কূফায় এসেছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতিনিধি হয়ে। কূফাবাসী তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল। তারা তাঁর পিছে-পিছে থাকতো এবং জান-মাল কুরবানী করার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান গভর্নরের ধমকীতে সবাই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছে এবং বেঈমানী করে সবাই তাঁর জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি অসহায় অবস্থায় অলি-গলিতে ঘুরছিলেন। যাক, খোদা তায়ালা আমাকে সৌভাগ্যবান করেছেন, আজ তিনি আমার ঘরে মেহমান এবং আমার ঘরে অবস্থান করছেন। তিনি আমার গরীবালয়ে ক্বদম রেখেছেন। এর জন্য আমি আজ গর্ববোধ করছি যে, আমি তাঁর মেহমানদারীর সুযোগ লাভ করলাম। এ জন্যই একদিকে আজ আমি খুবই আনন্দিত, আর অন্যদিকে আমি খুবই দুঃখিত যে, কূফাবাসীরা একজন সম্মানিত মেহমানের সাথে এ ধরনের বেঈমানী করতে পারলো।

বৃদ্ধা মহিলাটি যখন এসব ঘটনা বলছিলেন, তাঁর সেই নাফরমান ছেলে মনে মনে খুবই খুশি হলো এবং মনে মনে বলতে লাগলো- শিকার হাতের মুঠোয়, এটাতো বড় সৌভাগ্যের বিষয়। নাঊযুবিল্লাহ! আমার মা’ তো একজন সাধা-সিধে মহিলা। তিনি কি জানেন ইবনে জিয়াদের ঘোষণার কথা? ইবনে যিয়াদ তো ঘোষণা করেছে, যে ব্যক্তি হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গ্রেফতার করতে পারবে, তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে। যা হোক, তিনি যখন সৌভাগ্যবশতঃ আমার ঘরে এসে গেছেন, আমি খুবই সকালে গিয়ে খবর দিয়ে উনাকে আমার ঘর থেকে গ্রেফতার করাবো এবং হাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করবো। ছেলে এই অসৎ উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা তার মা’র কাছে গোপন রাখলো।এদিকে সে অস্থির হয়ে পড়লো, কখন সকাল হবে, কখন খবর পৌঁছাবে এবং পুরস্কার লাভ করবে। ফজর হওয়া মাত্রই সে তার অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে ইবনে যিয়াদকে খবর দিলো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওর ঘরেই অবস্থান করছেন, সে হলো সংবাদদাতা এবং সেই পুরস্কারের দাবিদার। ইবনে যিয়াদ বললো, তোমার পুরস্কার তুমি নিশ্চয়ই পাবে, প্রথমে উনাকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করো। সে বললো, ঠিক আছে, আমার সাথে সিপাই পাঠিয়ে দিন। তার কথা মতো তার সাথে সত্তরজন সিপাই গেল এবং সেই মহিলাটির ঘর চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো।
হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত:

হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পুনরায় লড়তে শুরু করলেন। এ খবর যখন ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছলো তখন সে মুহম্মদ বিন আশআছকে পাঠালো এবং তাকে বললো, তুমি গিয়ে কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক পন্থায় উনাকে বন্দী করে আমার কাছে নিয়ে এসো। সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে এসে বললো, ‘ওরা আসলে বোকামী করেছে। ওদেরকে ইবনে যিয়াদ মোকাবিলা বা লড়াই করার জন্যে পাঠায়নি। ওদেরকে পাঠানো হয়েছিল আপনাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আপনি আমার সাথে গভর্নর ভবনে চলুন। আপনি গভর্নরের সাথে কথা বলুন, তিনি আপনার সাথে মত বিনিময় করতে চান। কারণ তিনি চাচ্ছেন, ইত্যবসরে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামও কূফায় এসে পৌঁছবেন। তাই যেন কোন ফিতনা-ফাসাদের সৃষ্টি না হয়। গভর্নরের কাছে চলুন, কথাবার্তার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হোন। মত বিনিময়ের মাধ্যমে হয়ত সন্ধিও হয়ে যেতে পারে।

হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমিও তো তাই চাচ্ছি। তা’ না হলে আমি যখন চল্লিশ হাজার সমর্থক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলাম তখন আমার একটু ইশারাই গভর্নর ভবন তছনছ এবং ইবনে যিয়াদকে গ্রেফতার করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আমি এটা নিজে পছন্দ করি না যে, মারামারি বা খুন-খারাবী হোক। মুহম্মদ বিন আশআছ বললো, আমার সাথে চলুন, সিপাইদেরকে ধমকের সুরে বললো, তলোয়ার খোলা রাখছো কেন? বেকুবের দল কোথাকার, তলোয়ার খাপের মধ্যে ভরে রাখো। এভাবে ওদেরকে ধমক দিল আর উনাকে সাথে নিয়ে চললো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তার সাথে গেলেন এবং গভর্নর ভবনে প্রবেশ করার সময় এই দুআটি পড়লেন-

ربنا افتح بيننا وبين قومنا بالحق وانت خير الفاتحين

‘রব্বানাফ্তাহ্ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বওমিনা বিল্হাক্কি ওয়া আংতা খইরুল ফাতিহীন।’ (সূরা আ’রাফ-৮৯)

এই দুআটি পড়তে পড়তে যখনই তিনি গভর্নর ভবনের শাহী দরজায় প্রবেশ করলেন, এদিকে ইবনে যিয়াদ উম্মুক্ত তলোয়ারধারী কিছু সিপাহীকে দরজার দু’পাশে নিয়োজিত করে রেখেছিল এবং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করা মাত্রই দু’দিক থেকে আক্রমণ করে যেন উনাকে শহীদ করা হয়। নির্দেশ মত যখনই তিনি গভর্নর ভবনের দরজায় পা রাখলেন, তখনই তাঁর উপর দু’দিক থেকে তলোয়ার দ্বারা আক্রমণ করা হলো এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)

উলামায়ে কিরাম-এর কেউ কেউ তাঁদের কিতাবে লিখেছেন যে, তিনি যথারীতি ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছেছেন এবং আলোচনা করেছেন। ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললো, দেখুন, আপনি বড় অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন। তথাপি একটি শর্তে আমি আপনাকে রেহাই দিতে পারি। শর্তটি হচ্ছে, আপনি ইয়াযীদের বাইয়াত গ্রহণ করুন এবং প্রতিশ্রুতি দিন যে, যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আসবেন, উনাকেও ইয়াযীদের বাইয়াত করিয়ে দিবেন। এতে সম্মত হলে আপনাকে আমি মুক্তি দিতে পারি। অন্যথায় আপনার ও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কোন নিস্তার নেই। নাঊযুবিল্লাহ।হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উত্তরে বললেন, ‘প্রস্তাব মন্দ নয়, তবে আমি কিংবা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে পারি না। এটা কখনো কল্পনাও করা যায় না যে, আমরা ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হবো। তাই তোমার যা ইচ্ছা তা করতে পার।’ ইবনে যিয়াদ পুনরায় বলল, যদি আপনি বাইয়াত গ্রহণ না করেন ও ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকেও বাইয়াত করানোর ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আমি আপনাকে শহীদ করার নির্দেশ দিব। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দৃঢ়কন্ঠে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছে তা করতে পার।‘

ইবনে যিয়াদ জল্লাদকে নির্দেশ দিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর নিয়ে গিয়ে শহীদ করো এবং মাথা কেটে আমার কাছে নিয়ে আসো আর দেহকে রশি বেঁধে বাজারে হেঁচড়াও, যাতে হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং লোকেরা যেন এই দৃশ্য অবলোকন করে। জল্লাদকে হুকুম করার পর, ওরা যখন উনাকে ধরতে আসল, তখন হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, গভর্নর ভবনের চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। তারা সব এসেছে তামাশা দেখার জন্য। কিন্তু আফসুস! এদের মধ্যে অনেকে এসেছে যারা হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, যারা চিঠি লিখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে কূফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।
হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওদেরকে দেখে বললেন, ‘হে কূফাবাসী! তোমরা বেঈমানী করেছ; তা সত্ত্বেও এখন আমি তোমাদেরকে তিনটি কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি। যদি পার, এই তিনটি কাজ তোমরা অবশ্যই করবে। প্রথম কাজ হচ্ছে, আমার কাছে যে হাতিয়ারগুলো আছে, এগুলো বিক্রি করে অমূক অমূককে দিও। কারণ, আমি ওদের কাছে ঋণী। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, যখন আমার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং আমার লাশ বাইরে নিক্ষেপ করবে, তোমরা আমার লাশটি উঠিয়ে কোন এক যথোপযুক্ত স্থানে দাফন করো। তৃতীয় কাজ হচ্ছে, যদি তোমাদের মধ্যে এক তিল পরিমাণও ঈমান থাকে এবং আহলে বাইত-এর প্রতি এক কণা পরিমাণও মুহব্বত থাকে, তাহলে যে কোন উপায়ে তোমরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে সংবাদ পৌঁছে দিও, যেন তিনি কূফায় তাশরীফ না আনেন। এসব কথা শুনে ইবনে যিয়াদ খুবই রাগান্বিত হলো এবং চারিদিকে ঘুরে সবাইকে হুমকি দিতে লাগলো, খবরদার! যারা হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এই সব কথামত কাজ করবে, আমি তাদেরকে কতল করাবো এবং তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠাবো, যাতে কেউ হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথা অনুসরণ করতে না পারে। এবং সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললো, আমি আপনার হাতিয়ারগুলো আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে বণ্টন করবো এবং আপনার লাশকে দাফন করতে দিব না। বরং কূফার অলিতে-গলিতে ঘুরাবো এবং জনগণকে দেখাবো। যারা আপনার পক্ষ অবলম্বন করবে, নিশ্চয়ই তাদের সাথে এই রকম আচরণ করা হবে। আর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে খবর দেয়া থেকে বাধা দেয়ার কারণ হলো, উনাকে এখানে আনা চাই এবং উনাকেও ইয়াযীদদ্রোহীতার স্বাদ উপভোগ করাতে চাই। নাঊযুবিল্লাহ।হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভবিষ্যত পরিণতির কথা চিন্তা করে তখন ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং কূফাবাসীর বিশ্বাস-ঘাতকতার কথা উনাকে আরও বেঁদনাক্লিষ্ট করল। এমন সময় জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদের এক কিনারে নিয়ে গেল। তিনি তাদের কাছে দুই রাকায়াত নফল নামায পড়ার অবকাশ চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেই সুযোগটাও দিল না। তিনি অশ্রু-সজল নয়নে মক্কা শরীফ-মদীনা শরীফ-এর দিকে তাকালেন এবং তাকিয়ে বললেন, ওগো আমার মাওলা হুসাইন! আমার এই অবস্থার খবর আপনাকে কে পৌঁছাবে? আমার সাথে কী যে নির্মম আচরণ করা হচ্ছে। হায়! আমি যদি আপনাকে চিঠি না লিখতাম এবং কূফার অবস্থা সন্তোষজনক না জানাতাম তাহলে আপনি এখানে কখনো আসতেন না। কূফাবাসীরা আজ আমার সাথে যেভাবে বিশ্বাস ঘাতকতা করলো, জানিনা, আপনার সাথে কি ধরণের আচরণ করবে? উনি এসব চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। আর এদিকে জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদে শুইয়ে শরীর মুবারক থেকে মস্তক মুবারক বিচ্ছিন্ন করে ফেললো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here