বিষয়- কারবালার পর পবিত্র মক্কা ও মদীনায় ইয়াযিদী তান্ডবলীলা

0
32
views

কারবালার পর পবিত্র মক্কা ও মদীনায় ইয়াযিদী তান্ডবলীলা

  • মাওলানা শাহ্ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)

[ইয়াযীদ মুসলিম জাহানের ক্ষমতারোহণ করে মাত্র সাড়ে তিন বছর রাজত্ব করে। তার দ্বারা মুসলমানদের কোনো উপকার হয়নি। বরং যা হয়েছে তা হলো চরম দু:খ, লাঞ্ছনা ও লোমহর্ষক গঞ্জনা। তার সৈন্যরা প্রথম বছর কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.)-কে বাহত্তর জন সঙ্গী-সাথীসহ হত্যা করে, দ্বিতীয় বছর পবিত্র মদীনা শরীফে ভয়ঙ্কর হত্যাকান্ড সংঘটিত করে এবং তৃতীয় বছর পবিত্র মক্কা নগরীকে দু‘মাস অবরুদ্ধ রেখে পবিত্র কাবাগৃহে অগ্নি সংযোজন করে। এখানে আমরা কারবালার পর ইয়াযীদ বাহিনী কর্তৃক মদীনা ও মক্কায় যে হত্যালীলা ও লোমহর্ষক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তার কিয়দংশ বর্ণনার আশা রাখি।]

কারবালায় হযরত ইমাম হোসাইন (আ:)-এর শাহাদাতের পরে মদীনায় ইয়াযীদ কর্তৃক যে লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয় এটাই ‘হাররা’র ঘটনা নামে অভিহিত। এ স্থানটি মদীনা নগরী থেকে এক মাইল দূরে অবস্থিত। মদীনা তায়্যিবাতে যে সব হত্যাকান্ড, সংঘর্ষ ও এ পবিত্র স্থানের অবমাননার ঘটনা ঘটেছে সে সব ঘটনা বর্ণনার দ্বারা যদিওবা পবিত্র অন্তরবিশিষ্ট লোকদের অন্তর দু:খ ভরাক্রান্ত হয়, কিন্তু হুজুর আকরাম (সা:) এ সমুদয় অঘটনের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, তাই এ সম্পর্কে এখানে কিঞ্চিৎ আভাস দেয়া দরকার। যেমন তিনি এরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি মদিনাবাসীকে কষ্ট দেবে এবং ভীতসন্ত্রস্ত করবে, সে দুনিয়া ও আখিরাতের আযাবে গ্রেপ্তার হবে। ‘হাররা’ এলাকায় যে অঘটন ঘটেছে উক্ত হাদিস দ্বারা এর সত্যতা প্রমাণিত হয়।
কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, ‘হাররা’র’ ঘটনা এ হাদিসের দ্বারাও সত্যায়িত করা হয়। তিনি ইরশাদ করেছেন- মদীনা শরীফ আবাদ হওয়ায়র পর আবার বিরান হয়ে যাবে, মানুষও এ স্থান ছেড়ে চলে যাবে এবং মরু এলাকার পশুপক্ষী এখানে এসে বসবাস করবে। কিন্তু বাস্তব এই যে, মদীনার এ অবস্থা কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দেখা দেবে, ইমাম নববী এ কথা বলেছেন। কেননা, কোনো কোনো হাদিসে যে সমুদয় বর্ণনা পাওয়া যায়, এতে বুঝা যায় যে, ‘হাররা’র’ ঘটনায় এটা পরিলক্ষিত হয়নি। যেমন- ইবনে আবি শা’ইবা উল্লেখ করেছেন, এ পবিত্র নগরী চল্লিশ বছর যাবৎ বিরান হয়ে পড়ে থাকবে। তথায় হিংস্র জন্তু এবং পশু-পাখি বসবাস করবে। অত:পর মুজনিয়া গোত্রের দু’জন রাখাল এখানে এসে অবাক হয়ে পরস্পরকে বলবে, এখানকার জনপদ কোথায় গেল? তারা সেখানে বন্য জীবজন্তু ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাবে না। এতে বুঝা যায় যে, এটা কিয়ামত পূর্বকালীন সময়ের ঘটনা হবে।‘হাররা’র’ মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে- মদীনার ওপর এমন এক সময় উপস্থিত হবে যে, মদীনার বাসিন্দাদেরকে এখান থেকে বের করে দেয়া হবে। সাহাবাগণ আরজ করলেন: ‘কে তাদেরকে বের করে দেবে?’ এরশাদ করলেন: ‘দুষ্ট আমীরগণ’। বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদিসে বর্ণিত আছে যে, নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন: ‘কুরাইশ গোত্রীয় লোকের হাতে আমার উম্মত ধ্বংস হবে।’ সাহাবাগণ আরজ করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! তখন আমাদের জন্য কী নির্দেশ? এরশাদ করলেন: ‘তখন তোমাদের একাকীভাবে জীবন-যাপন করা উচিত।’ অপর এক হাদিসেও হযরত আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত (সা:) এরশাদ করেছেন: ‘যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি, মদীনায় এমন এক যুদ্ধ সংঘটিত হবে, যার ফলে “দ্বীন” এখানে থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন মাথা মুন্ডনের ফলে চুল মাথা থেকে খসে পড়ে যায়। সে দিন তোমরা মদীনার বাইরে চলে যেও, এক মনজিলের ব্যবধান হলেও।’ হযরত আবু হুরাইরাহ থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি এভাবে দোআ করতেন: ‘হে আল্লাহ! আমাকে ষাট হিজরীর অঘটন এবং ছেলেদের রাজত্ব থেকে রক্ষা করুন। সে আসার পূর্বেই আমাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিন। এতে ইয়াযীদের হুকুমতের প্রতিই ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা, সে ষাট হিজরীতে সিংহাসনে আরোহণ করেছে এবং ‘হাররা’র ঘটনা তারই রাজত্বকালে সংঘটিত হয়েছে।

ওয়াকেদী ‘হাররা’ নামক কিতাবে আইয়ুব ইবনে বশর থেকে বর্ণনা করেছেন- রাসূল (সা:) একদা সফর করে ‘হারা নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন দাঁড়িয়ে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েন। এতে সাহাবাগণ মনে করলেন যে, হয়ত সফরের পরিণতি শুভ হবে না। তাঁকে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলো। হযরত ওমর (রা.) আরজ করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আপনি কী ভেবে ইন্নালিল্লাহ পড়লেন? তিনি বললেন: ‘হাররা’র এ মরুপ্রান্তরে আমার সাহাবাদের পরে আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হবে। অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর হস্ত মুবারকের দ্বারা ইশারা করে বললেন: এ ‘হাররা’র মরুপ্রান্তরে আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে হত্যা করা হবে।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হযরত কা‘বে আহবার থেকে বর্ণনা করেন যে, হযরত কাব বলতেন, ‘তাওরাত’ কিতাবে বর্ণিত আছে যে, মদীনা মুনাওয়ারার পূর্বদিকের মরুপ্রান্তরে উম্মতে মুহাম্মাদীয়া (সা:) এর এমন কতক লোক শাহদাত বরণ করবেন, যাঁদের চেহারা চৌদ্দ তারিখের চন্দ্রের আলো থেকে উজ্জ্বল। ইবনে যুবলা থেকে বর্ণিত আছে- একদা আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতের আমলে খুব বৃষ্টিপাত হয়। তখন তিনি তাঁর বন্ধু-বান্ধবসহ মদীনার বাইরে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। যখন ‘হাররা’ নামক স্থানে পৌঁছেন এবং দেখতে পান যে, চতুর্দিকে পানির ডেউ বয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর সাথী হযরত কাবে আহবার (রা.) শপথ গ্রহণ করে বললেন: ‘এখানে যেভাবে পানির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, ঠিক এমনিভাবেই এখানে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হবে।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কোন সময়ে হবে?’ তিনি উত্তর দিলেন: ‘হে যুবাইয়ের পুত্র! তুমি এর থেকে সতর্ক থাক যেন তোমার হস্তপদের দ্বারা এটা সংঘটিত না হয়।’সীরাত লেখক এবং ঐতিহাসিকরা সংক্ষেপে এবং বিস্তারিতভাবে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁদের উদ্বৃতিসমূহ হুবহু নিম্নে পেশ করা হলো যাতে আসল ঘটনা অস্পষ্ট না থাকে।

কুরতবী বলেন: ‘মদীনাবাসীর মদীনা থেকে বাইরে চলে যাওয়ার কারণ এ ‘হাররা’র মর্মান্তিক ঘটনা। যেমন- কোনো কোনো হাদিসে বর্ণিত আছে- যে সময় মদীনা শরীফ অবশিষ্ট সাহাবা এবং তাবেয়ী দ্বারা পরিপূর্ণ এবং লোক বসতিতে ভরপুর এবং তার চিত্তাকর্ষক সাদৃশ্য বিদ্যমান তখন মদীনাবাসীর ওপর একের পর এক বিপর্যয় এবং অঘটন নেমে আসে ফলে তাঁরা মদীনা ছেড়ে বাইরে চলে যান। পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ মুসলিম ইবনে উকবার নেতৃত্বে শামদেশীয় এক বিশাল সৈন্য বাহিনী যুদ্ধ করার জন্য মদীনায় প্রেরণ করে। সৈন্য বাহিনীর বদবখত লোকেরা তিন দিন পর্যন্ত মসজিদে নববীর সম্মানহানিকর কাজে লিপ্ত থাকে। এ কারণেই একে ‘হাররা’র ঘটনা বলা হয়। এটা শহর থেকে এক মাইল দূরে অবস্থিত।
এ মর্মান্তিক ঘটনার প্রাক্কালে ইয়াযীদের কুচক্রী দল শিশু এবং নারী ব্যতীত মদীনার বিশিষ্ট ও সম্মানিত বার হাজার চারশ’ সাত্তানব্বই জন লোককে হত্যা করে।

মদীনায় সংঘটিত হত্যাকান্ডে শহীদানের তালিকা:
১. মুহাজির, আনসারে, তাবেয়ীন, উলামা- ১,৭০০ জন
২. সাধারণ লোক ১০,০০০ জন
৩. কুরআনের হাফিজ ৭০০ জন
৪. কুরাইশ ৯৭ জন
সর্বমোট = ১২,৪৯৭ জন

‘হাররাহতে’ এ লোমহর্ষক ঘটনা ছাড়াও ইয়াযীদের সৈন্যরা নানা প্রকার অত্যাচার, অনাচার ও ধৃষ্টতাপূর্ণ অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং যিনার মতো ঘৃণ্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বর্ণিত আছে যে, এ ঘটনার পর এক হাজার অবৈধ সন্তান প্রসব করে। এ সব পাপিষ্ঠ লোক মসজিদে নববীর অমার্জনীয় অবমাননা করে। এ পবিত্র স্থানকে তারা ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত করে। হুজুর আকরাম (সা.) এর রওজায়ে পাক এবং মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থান (যার সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, এখানে বেহেশতের বাগান সমূহের একটি বাগান আছে) ঘোড়ার মলমূত্র দ্বারা কলুষিত করে। আর লোকদের থেকে ইয়াযীদের জন্য এভাবে বাইআন নেয়া হয় যে, ইয়াযীদ যদি ইচ্ছা করে, তাদেরকে বিক্রয় করতে পারবে অথবা স্বাধীনভাবেও রাখতে পারবে। সে যদি ইচ্ছে করে আল্লাহর বন্দেগীতেও রাখতে পারবে অথবা তাঁর নাফরমানি করারও নির্দেশ দিতে পারে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ (রা.) যখন ইয়াযীদকে বললেন, বাইআততো অন্তত:পক্ষে কুরআন ও সুন্নতের ওপর গ্রহণ করা চাই। তখনই ইয়াযীদ তাঁকে হত্যা করে ফেলে।ইমাম কুরতবী বলেন- ঐতিহাসিকরা লিখেছেন যে, মদীনা মুনাওয়ারা তখন জনশূন্য হয়ে যায়। তখন মরুর পশুপাখিরা তথাকার ফলমূল ভক্ষণ করত। মসজিদে নববী কুরের বাসস্থানে পরিণত হয়। এ সকল ঘটনার দ্বারা হুজুর (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়।

তাবরানী হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর থেকে রেওয়ায়েত করেন যে, হযরত মু‘আবিয়া (রা.)-এর ইন্তিকালের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ইয়াযীদের হাতে বাইআত এবং আনুগত্য করতে অস্বীকৃত জ্ঞাপন করেন এবং তার নিন্দাবাদ করতে থাকেন। ইয়াযীদ এ কথা শ্রবণে শপথ নিয়ে বলল: ‘খোদার কসম, আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর-এর গলায় বেড়ী পরাব।’ অত:পর সে একজন দূত মারফত তাঁকে ডেকে পাঠায়। দূত এসে তাকে বলল: আপনি রৌপ্যের একটি ফাঁদ তৈরি করুন এবং ইয়াযীদের শপথ পূরণকল্পে গলার মধ্যে তা ঝুলিয়ে দিন, আর এর ওপর স্বীয় কাপড় পরিধান করুন, তবে আশা করি আপনি রক্ষা পাবেন।’ আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) বললেন: ‘আল্লাহ তাআলা কখনও তার শপথকে বাস্তবায়িত করবেন না। আমি অন্যায়ের কাছে কখনও আত্মসমর্পণ করবো না। যতক্ষণ শক্ত পাথর দাঁতের নিচে নরম হবে না।’ অত:পর আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) জনগণকে তাঁর বাইআত গ্রহণ ও অনুগত্য স্বীকারের দাওয়াত দিতে লাগলেন। এ দিকে পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ মুসলিম ইবনে উকবার নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনী শাম (সিরিয়া) থেকে মদীনা অভিমুখে প্রেরণ করে। তাদেরকে সে এ নির্দেশ দিয়েছিল যে, মদীনাকে ধ্বংস করে দেয়ার পর মক্কায় চলে যাবে এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরকে হত্যা করবে। মুসলিম ইবনে উকবা যখন মদীনায় পৌঁছে তখন সকল সাহাবায়ে কেরাম মদীনা শরীফের বাইরে চলে গেলেন। মুসলিম ইবনে উক্বা অবশিষ্ট লোকদের হত্যা করার পর মক্কা শরীফ অভিমুখে যাত্রা করল। পথিমধ্যে সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মৃত্যুর সময় সে হোসাইন ইবনে নুমাইর কিন্দীকে স্বীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করে এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-কে অবরোধ করার জন্য পবিত্র মক্কায় কামানের গোলা নিক্ষেপ এবং অগ্নিসংযোগের নির্দেশ দেয়। হোসাইন পথিমধ্যে থাকাকালেই ইয়াযীদের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে। হোসাইন পালিয়ে গেল এবং সে তার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বপালন করতে পারল না।ইবনে জওযী বলেন, বাষট্টি হিজরীতে ইয়াযীদ তার চাচাত ভাই উসমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে তার বাইআত গ্রহণের জন্য মদীনায় প্রেরণ করে। উসমান মদীনাবাসী একটি দলকে ইয়াযীদের নিকটে পাঠিয়ে দেন। যখন তাঁরা ইয়াযীদের কাছ থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁরা ইয়াযীদকে গালিগালাজ করতে লাগলেন ও বললেন যে, সে ধর্মদ্রোহী, মদখোর, ফাসিক। সে কুকুর পালন করে। এ কথা বলে তাঁরা তার বাইআত বর্জন করলেন। ইয়াযীদের নিকট গমনকারী লোকদের মধ্যে হযরত মুনযির (রা.) ও ছিলেন। তিনি বললেন: ‘ইয়াযীদ আমার বড় উপকার করেছে। সে আমাকে এক লক্ষ দিরহাম অনুদান দিয়েছে। কিন্তু এজন্য আমি সত্যকে পরিত্যাগ করতে পারিনি। সে মদ্যপায়ী ও বেনামাযী। তাঁর মুখ থেকে এ কথা শোনার সাথে সাথেই লোকজন তার বাইআত প্রত্যাখ্যান করে আবদুল্লাহ ইবনে হানযালার হাতে বাইআত গ্রহণ করল আর উসমানকে মদীনা থেকে বের করে দিল। আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা (রা.) বলতেন: ‘যদি আসমান থেকে প্রস্তর বর্ষণের আশংকা না করতাম, তবে ইয়াযীদের বাইআত প্রত্যাখ্যান করতাম না এবং তার মোকাবিলা করার ঝুঁকি গ্রহণ করতাম না। ইবনে জওযী আবদুল হাসান মাদাহেনী থেকে বর্ণনা করেন যে, ইয়াযীদের পাপাচার এবং কুকর্মসমূহ প্রকাশিত হওয়ার পর মদীনাবাসী মিম্বররের ওপর আরোহণ করে তার বাইআত প্রত্যাখ্যান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু আমর ইবনে হাফস মখযুমী মাথা থেকে পাগড়ি নিক্ষেপ করে বললেন: ‘ইয়াযীদ আমার বড় উপকার করেছে এবং আমাকে বিশেষ অনুদানে সম্মানিত করেছে কিন্তু সে আল্লাহর শত্রু এবং মদপানে আসক্ত ব্যক্তি; আমি তার বাইআত এভাবে প্রত্যাখ্যান কলাম যেভাবে এ পাগড়িকে নিক্ষেপ করেছি।’ এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে জুতা নিক্ষেপ করে তার বাইআত প্রত্যাখ্যান করল। এভাবে পাগড়ি এবং জুতাতে মজলিস ভরে গেল। অত:পর আবদুল্লাহ ইবনে মুতী (রা.)-কে কুরাইশের এবং আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা (রা.)-কে আনসারের প্রশাসক নিযুক্ত করা হলো।

উমাইয়্যা বংশীয় লোকদেরকে মারওয়ানের গৃহে অবরুদ্ধ করা হলো। উমাইয়্যাগণ তাদের এ দুরবস্থার সংবাদ ইয়াযীদের কাছে পাঠিয়ে সৈন্য দিয়ে সাহায্যের আবেদন জানায়। ইয়াযীদ তাদের সহায্যার্থে মুসলিম ইবনে উকবাকে মদীনায় প্রেরণ করে। এ হতভাগা যদিও বৃদ্ধ, কিন্তু মদীনাবাসীকে রক্ত শ্রোত প্রবাহিত করার ঝুঁকি গ্রহণ করে। অত:পর ইয়াযীদ একথাও ঘোষণা করে যে, যে ব্যক্তি হেজাযে গমন করবে তাকে যুদ্ধের এবং সফরের যাবতীয় আসবাবপত্র ছাড়াও একশ দিনার করে বখশিস দেয়া হবে। এ ঘোষণা শুনে বার হাজার লোক হেজায গমনে রাজি ফারজানাকে নির্দেশ দিল যে, তুমি তথায় গিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর-এর সাথে যুদ্ধ কর। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, একজন ফাসিকের সন্তুষ্টির নিমিত্তে আমি পয়গম্বর আলাইহিস সালামের একজন আওলাদের হত্যা এবং হেরেম শরীফে আল্লাহর ঘরের মধ্যে লড়াইয়ের ঝুঁকি নিতে পারি না।’ এরপর সে মুসলিম ইবনে উকবাকে সেখানে পাঠিয়ে দেয়। সে তাকে নির্দেশ দেয় যে, যদি কোনো অঘটন ঘটে তবে হোসাইন ইবনে নুমাইরকে তোমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করবে। সে আরও নির্দেশ দিল যে, যার বিরুদ্ধে তোমাকে পাঠানো হচ্ছে তাকে তিনবার দাওয়াত দেবে, যদি দাওয়াত গ্রহণ করে তবে তাকে ছেড়ে দেবে। আর যদি দাওয়াত কবুল না করে, তবে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। বিজয় লাভ করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

সেখানে সম্পদ, অস্ত্র এবং খাদ্য ইত্যাদি যা কিছু পাও তা সৈন্যদের জন্য হালাল করে দাও। তিনদিন পর যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে। হযরত হোসাইনের পুত্র হযরত আলী ওরফে যায়নুল আবেদীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ো না। কেননা, তিনি ঐ দলকে সমর্থন করেন না। যখন মদীনাবাসীর নিকট এ খবর পৌঁছে তখন মদীনাবাসী সমবেতভাবে ইয়াযীদের সৈন্যদের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। বনী উমাইয়্যার যে দলটি মারওয়ানের গৃহে অবরুদ্ধ ছিল, তাঁরা তাদের নিকট গিয়ে বললেন: ‘তোমরা এ কথার প্রতিশ্রুতি দাও যে, তোমরা ধোঁকাবাজি, প্রতারণা এবং গোয়েন্দাগিরি করবে না এবং আমাদের শত্রুদের কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করবে না। তা হলেই আমরা তোমাদেরকে ছেড়ে দিতে পারি; অন্যথায় আমরা তোমাদেরকে হত্যা করব।’ বনী উমাইয়্যার ঐসব লোক মুনাফিকী করে মদীনাবাসীর সাথে শামিল হয়ে মুসলিম ইবনে উকবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে আসে। মারওয়ান ইবনে হাকাম গোপনে স্বীয় পুত্রকে মুসলিম ইবনে উকবার নিকট প্রেরণ করে এ কথা বলে যে, মদীনায় পৌঁছে তিনদিন যেন যুদ্ধ স্থগিত রাখে। তিনদিন পর মারওয়ান মদীনাবাসীর সাথে পরামর্শ করে তাদেরকে বলল: ‘তোমরা কি সিদ্ধান্ত নিয়েছ? তাঁরা বললেন: ‘যুদ্ধ ব্যতীত গতি নেই।’
মারওয়ান বলল: ‘যুদ্ধ করা উচিত হবে না। এতে ফাসাদ বেড়ে যাবে। ইয়াযীদের হাতে বাইআত করাই আমি সমীচীন বলে মনে করি। কিন্তু মদীনাবাসী তা পছন্দ করলো না এবং ইয়াযীদের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার জন্য মদীনার বাইরে চলেন গেলেন।এক দিকে আবদুল্লাহ ইবনে হানযালা (রা.) যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, অপর দিকে মুসলিম ইবনে উকবা বার্ধক্যজনিত কারণে পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে স্বীয় সেনাবাহিনীকে উৎসাহিত করছিলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুতী (রা.) তাঁর সাত পুত্র সহকারে শত্রুর মোকাবিলা করে শাহাদাত বরণ করেন। মুসলিম ইবনে উকবা তাঁর মস্তক মুবারক দ্বিখন্ডিত করে ইয়াযীদের নিকট পাঠিয়ে দেয়। অবশেষে ইয়াযীদ বাহিনী বিজয় লাভ করে। ইয়াযীদের সৈন্যবাহিনী তার নির্দেশ মোতাবেক মদীনা মুনাওয়ারায় তিনদিন পর্যন্ত অত্যাচার, অবিচার ও ব্যভিচার চালায়, সম্পদ লুটপাট করে এবং যিনার মতো জঘন্য কার্যে লিপ্ত হয়।
ওয়াকেদী বলেন: ‘যখন ইয়াযীদের সেনাবাহিনী মদীনার নিকট পৌঁছে তখন মদীনাবাসী পরস্পরের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো মদীনার চতুর্দিকে দীর্ঘ পনের দিন অত্যন্ত দু:খ-কষ্ট সহ্য করে পরিখা খনন করেন। মদীনার চতুর্দিকে তারকাঁটার বেড়া লাগিয়ে দেন এবং দুশমনের পথ অবরোধ করে চতুর্দিক থেকে তাদের ওপর তীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে থাকেন। এতে শত্রুবাহিনী মদীনায় প্রবেশ করতে বাধার সম্মুখীন হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে মুসলিম ইবনে উকবা ভীত হয়ে ‘হাররা’র এক কোণায় অবস্থান করে এবং মারওয়ানের নিকট এ মর্মে লোক প্রেরণ করে যে, যুদ্ধে জয়লাভ করার কোনো একটি পথ বের করতে, যাতে সফলকাম হওয়া যায়। মারওয়ান বনী হারেসার নিকট গমন করে তাদেরকে লোভ-লালসায় আকৃষ্ট করে মদীনার এক দিকে রাস্তা খুলে দিল। ইয়াযীদের সেনাবাহিনী সে পথ দিয়ে মদীনায় প্রবেশ করে এবং মদিনাবাসী অপর দিক থেকে গুটিয়ে এসে শুধু সে দিকে এসেই যুদ্ধে লিপ্ত হন।
ইবনে আবি খাইসামা বিশুদ্ধসূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, মদীনার বৃদ্ধ লোকজন বর্ণনা করেন যে, হযরত মু’আবিয়া তাঁর মৃত্যুকালে ইয়াযীদকে ডেকে বলেছিলেন: ‘আমার মনে হয় মদীনাবাসীর সাথে একদিন তোমাকে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে হবে। সে সময় তুমি মুসলিম ইবনে উকবার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করে নিও! কেননা, এ ব্যাপারে তার চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত আর কেউ নেই।’ পিতার মৃত্যুর পর যখন ইয়াযীদ সিংহাসনে আরোহণ করে তখন মদিনাবাসীর সাথে তার দ্বন্দ আরম্ভ হয়। সে পিতার নির্দেশ মতো এ সমস্যার সমাধান করে।

কথিত আছে যে, এক বৃদ্ধা মুসলিম ইবনে উকবার নিকট এসে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ করলেন: ‘আমার পুত্র বন্দি হয়েছে, আপনি তাকে মুক্তি দিন’। সে তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিল যে, তার ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে তার গর্দান দু’টুকরা করে যেন মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয়। নির্দেশমত কাজ করা হলো এবং বৃদ্ধার হাতে তাঁর পুত্রের মস্তক সোপর্দ করে তাকে বলে দেয়া হলো, ‘তুমি নিজের জীবনের মঙ্গল না চেয়ে পুত্রকে রেহাই দানের সুপারিশ করাতেই এ পরিণতি হয়েছে।’
হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব যিনি একজন বিশিষ্ট তাবেয়ী ছিলেন তাঁকে মুসলিম ইবনে উকবার নিকট হাজির করা হয়। সে তাঁকে বলল: ‘ইয়াযীদের বাইআত গ্রহণ কর’ তিনি বললেন: ‘আমি আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর নীতি মোতাবেক বাইআত করেছি।’ এ সময় একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল: ‘এ একজন পাগল’। এ কথা বলার পর তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। মুসলিম ইবনে উকবা হত্যাকান্ডে এবং ফিতনিা-ফাসাদে অতিশয় সীমালঙ্ঘনকারী ছিল বিধায় সে ‘মাস্রিফ’ (সীমালঙ্ঘনকারী) নামে অভিহিত ছিল।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক ‘ওয়াকেদী’ তাঁর ‘কিতাবুল হাররা’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, একদা ইয়াযীদ মুসলিমের নিকট এসে দেখতে পায় যে, সে অর্ধাঙ্গ রোগে আক্রান্ত। ইয়াযীদ তাকে লক্ষ্য করে বলল: ‘যদি তুমি এ দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত না হতে তবে আমি তোমাকে মদীনা অভিযানে প্রেরণ করতাম। কেননা, আমি তোমার চেয়ে আর কাউকে আমার একনিষ্ঠ ভক্ত বলে মনে করি না। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা মু’আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আমাকে তাঁর মুমূর্ষ অবস্থায় অসিয়ত করেছেন: ‘যদি হেজাযবাসীর সাথে তোমার কোনো অঘটন ঘটে তবে তুমি মুসলিম ইবনে উকবার নিকট তোমার সমস্যার সমাধান চেয়ে নেবে”। এ কথা শোনামাত্র মুসলিম ইবনে উকবা উঠে দাঁড়ায় এবং বলে: ‘হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাকে শপথ দিয়ে বলছি- এ কাজ আমি ব্যতীত আর কারও ওপর ন্যস্ত করবেন না। কেননা, আমার থেকে মদীনাবাসীর আর কোনো বড় শত্রু নেই। এ সম্পর্কে আমি একটি স্বপ্নও দেখেছি যে, জান্নাতুল বাকীর একটি বৃক্ষের শাখা-প্রশাখাসহ হযরত উসমান (রা.) এ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নেয়ার ফরিয়াদ করছেন। আমি যখন বৃক্ষটির নিকটে যাই তখন বলতে শুনলাম, এ কাজ মুসলিম ইবনে উকবার দ্বারাই সম্পন্ন হবে। সে দিন থেকে আমার অন্তরে এ বিশ্বাস জন্মেছে যে, আমিই মদিনাবাসীকে হত্যা করব এবং এ আশায় মনকে সান্তনা দিয়েছি এই বলে- আমিই হযরত উসমান (রা.) এর হত্যাকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ করব।’ যখন ইয়াযীদ মুসলিম ইবনে উকবার মধ্যে এরূপ প্রেরণা ও আগ্রহ দেখতে পেল- তখন তাকে নির্দেশ দিল: ‘সত্ত্বর প্রস্তুতি গ্রহণ কর এবং আল্লাহর নাম নিয়ে মদীনা অভিমুখে যাত্রা কর। যদি মদীনায় প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হও এবং বাইআত গ্রহণে মদিনাবাসী রাজি না হয়, তবে তুমি ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলকে হত্যা করবে। তিনদিন পর্যন্ত এ কাজ চালিয়ে যাবে। কাউকে বাদ দেবে না। আর তাদের ধন-সম্পদ লুটপাট করে নেবে। অবশ্য যদি তারা বাইআত স্বীকার করে তবে তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ো না। সেখান থেকে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর-এর কাছে চলে যাবে এবং তার কাজ সম্পন্ন করবে।’
বর্ণিত আছে যে, মদীনার হরমের শহীদগণকে দেখে সে বলত: ‘আমি এ সব লোককে হত্যা করার পরও যদি দোযখে যাই তবে আমার থেকে হতভাগা আর কেউ নেই’।মারওয়ানের গোলাম যাকওয়ান বলে: ‘একদা মুসলিম ইবনে উকবা রোগের ঔষধ সেবন করার পর খাবার তলব করল। অথচ ডাক্তার তাকে নিষেধ করেছিল যে, ঔষধ সেবনের পর খাদ্য গ্রহণ করলে ঔষধ ক্রিয়াশীল হবে না। সে বলল: ‘এখন আমি জীবিত থাকার আর কোনো আশা করব না। কারণ, আমি তো হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের প্রতিশোধ গ্রহণ করে এখন স্বস্তিবোধ করছি। আমার অন্তরের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। মৃত্যু ব্যতীত এখন আমার কাছে আর কোনো কিছু প্রিয় নেই। এখন মৃত্যুই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমার বিশ্বাস এ সব নাপাককে হত্যা করার ফলে আল্লাহ তা’আলা আমার সমুদয় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেবেন।” সৈয়দ আলাহির রহমত বলেন: ‘তার গুনাহ মার্জনার ধারণা নিতান্ত মূর্খতা, অজ্ঞতা ও দুর্ভাগ্যের পরিচয়ক; কেননা, আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত এমন একদল বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামকে হত্যা করা এমন এক অপরাধ ও পাপের কাজ, যা ক্ষমা করা দূরের কথা, এর অশুভ পরিণতি থেকে তার রেহাই পাওয়াও অসম্ভব; এ তার দু:স্বপন্ন মাত্র।

যে সব সাহাবায়ে কেরামকে মদীনায় জোরপূর্বক অমানুষিকভাবে হত্যা করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফেরেশতা কর্তৃক গোসলপ্রাপ্ত হযরত হানযালা (রা.)-এর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রা.)। তিনি তাঁর সাত পুত্রসহ শহীদ হন। আর রয়েছেন রাসূল (সা.) এর অজুর বর্ণনা প্রদানকারী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যাইদ (রা.) ও হযরত মাকল ইবনে সিনান, যিনি মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে উপস্থিত ছিলেন এবং স্বীয় গোত্রের পতাকা বহন করেন।

ইবনে জওযী সনদের সূত্র ধরে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যেব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: ‘হাররার’ অঘটনের সময়ে রাত্রিতে আমি ব্যতীত আর কেউ মসজিদে নববীতে উপস্থিত হতো না। শাম দেশীয় লোকজন আমাকে মসজিদে দেখে বলত, এ পাগল বুড়ো! এখানে কী করছো? প্রত্যেক নামাযের সময় রাসূলে পাক (সা.) এর হুজরা শরীফ থেকে আযান, ইকামাতের আওয়াজ শুনে আমি নামায পড়তাম।’

‘হাররা’র এ হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রাক্কালে ইয়াযীদ বাহিনীর হাতে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু সাইদ খুদরী (রা.) সর্বশেষ লাঞ্ছিত হন। বর্ণিত আছে যে, এ গুন্ডাবাহিনী তাঁর দাড়ি মোবারক গোড়া থেকে উপড়ে ফেলে। লোকেরা তাঁর দাড়ির এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করতো: ‘আপনি কি দাড়ি নিয়ে খেলেছেন এবং দাড়ি উচ্ছেদ করে ফেলেছেন?’ তিনি উত্তর দিতেন: ‘না, বরং শাম দেশের লোকজন আমার ওপর এ অত্যাচার করেছে। শাম দেশীয় একদল লোক আমার ঘরে প্রবেশ করে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে যায়। তারপর আরেকদল প্রবেশ করে ঘরের মধ্যে কোনো আসবাবপত্র না পেয়ে আমার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here