বিষয়- কুরবানী কার উপর ওয়াজিব

0
114
views

কুরবানী কাদের উপর ওয়াজিব
স্বাধীন ও মুক্বীম (অমুসাফির) ব্যক্তি যিনি মালেকে নেসাব অর্থাৎ এতটুকু সম্পদের অধিকারী হন যতটুকু সম্পদ হলে সাদক্বায়ে ফিত্র ও যাকাত প্রদান ওয়াজিব হয়, তার উপর কোরবানী ওয়াজিব। মালেকে নেসাব’র ব্যাখ্যা হল-মানুষের মৌলিক চাহিদা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খরচ ব্যতীত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য ও সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা ওই পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া। মৌলিক চাহিদা বলতে বাসস্থান, আসবাবপত্র, অন্ন, বস্ত্র, চাকর, সফরের বাহন, হাতিয়ার ও পেশার সরঞ্জাম ইত্যাদি।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানী
যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানী দেয়া হয় তাহলে গোশ্ত ৩ ভাগের নিয়মে বন্টন করতে হবে। তবে যদি মৃত ব্যক্তির অসিয়ত পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানী করা হলে তার সবটুকু সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব।
কুরবানীর মাসআলা
চান্দ্র মাসের জিলহজ্বের ১০ তারিখ হতে ১২ তারিখ পর্যন্ত অর্থাৎ তিনদিন দুই রাত।
মাসআলা
যে ব্যক্তি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ ও সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা এ পরিমাণ অর্থ অথবা এমন কোন সামগ্রীর মালিক হয়-যার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য পরিমাণ হয়, তাহলে সে ধনী হিসেবে বিবেচিত, তাঁর উপর কোরবানী ওয়াজিব। [আলমগীরী]
মাসআলা
যদি কেউ বলে আমার ঐ কাজটি যদি হয়, তাহলে আমি কোরবানী করব। অথবা আল্লাহর কসম এ পশুটিকে আমি অবশ্যই আল্লাহর ওয়াস্তে কোরবানী করব-এ দু’শ্রেণীর লোক ধনী হোক কিংবা গরীব হোক, এদের উপর কোরবানী ওয়াজিব। [বাদায়ে’ ৫:৬২]
মাসআলা
কোন ধনী লোক মান্নতের কোরবানী দিলে, তার উপর যে কোরবানী ওয়াজিব, তা থেকে অব্যাহতি পাবেনা; বরং তার উপর পৃথকভাবে কোরবানী ওয়াজিব হবে; অর্থাৎ তাকে দু’টি কোরবানী দিতে হবে-একটি মান্নতের অপরটি মালেকে নেসাব হওয়ার কারণে। যদি কোরবানীর দিন শপথ করে তাহলে শপথের কোরবানী দ্বারা ওয়াজিব কোরবানীও আদায় হয়ে যাবে।
মাসআলা
কোরবানীর পশু ক্রয়ের আগে কোরবানীর পশুর অংশীদার ঠিক করা উত্তম। পশু ক্রয়ের পর অন্য কাউকে অংশীদার বানাতে চাইলেও পারবে; কিন্তু মাকরূহ।
মাসআলা
কোন গরীব লোক কোরবানীর নিয়তে কোরবানীর পশু ক্রয় করলে ঐ পশু হারিয়ে যাওয়ার পর যদি আবার ফিরে আসে, তবে ওই পশুতে অংশীদার নেয়া মাকরূহ।
মাসআলা
জীবিতের কোরবানী, মৃত ব্যক্তির (ওসিয়তের) কোরবানী এবং আক্বীকাকারী কোরবানীর পশুতে অংশীদার হতে পারবে; কিন্তু শর্ত হলো সবার উদ্দেশ্য যেন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হয়। কেউ যেন শুধু গোশ্ত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোরবানী না করে।
মাসআলা
কেউ যদি তাঁর মৃত মা-বাবা ও দাদা-দাদীর কবরে সাওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে এক অংশ কোরবানী করতে চায়, তাহলে পারবে। এতে কোরবানীদাতা একজন হলেও সবাই সাওয়াবের অংশীদার হবে।
মাসআলা
প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে অথবা স্ত্রীর অথবা এমন ব্যক্তির, যার উপরকোরবানী করা ওয়াজিব হয়েছে, ওয়াজিব কোরবানী তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে তাদের পক্ষ হয়ে কেউ কোরবানী করলে কোরবানীর ওয়াজিব আদায় হবে না। এমনকি তার কোরবানীর পশুর শরীকদার ব্যক্তিদের কোরবানীও হবে না। কিন্তু যার প্রতি বছর কোরবানী করার অভ্যাস আছে, তার কোরবানী জায়েয হবে। কিন্তু এ অবস্থায়ও অনুমতি বা পরামর্শ করা বেশী ভাল। [ফাত্ওয়া -এ কাযী খান -২০২পৃষ্ঠা]
মাসআলা
কেউ কোরবানীর পশু ক্রয় করার পর দেখা গেল কোরবানীর পশুটি হারিয়ে গেছে এমতাবস্থায় আরেকটি পশু ক্রয় করার পর প্রথমে হারিয়ে যাওয়া পশুটিও আবার পেয়ে গেল। এ অবস্থায় নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে অর্থাৎ যার উপর কোরবানী ওয়াজিব হয়নি। তার উপর দুটিই কোরবানী করে দেয়া ওয়াজিব। যদি মালেকে নেসাব হয়, তাহলে একটি যবেহ করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টির মূল্য যাতে কম না হয়। কম হলে তবে ওই পরিমাণ অর্থ সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব।-(বাদায়ে’ ৫ :৬৬)
মাসআলা
কেউ যিলহজ্বের ১০-১২ তারিখ পর্যন্ত তিন দিন দুই রাতের মধ্যে যদি কোরবানী করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তিনদিন পর ভেঁড়া বা ছাগলের মূল্য পরিমাণ অর্থ সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব। যদি মুমূর্ষু হয়, তাহলে ওসিয়ত করা অত্যন্ত কর্তব্য।
মাসআলা
কোরবানী কাযা হয়ে যাওয়ার পর যদি কেউ কোন পশু যবেহ করে, তবে তা সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব। যদি মূল্য কম হয়েছে বলে মনে হয় তবে যে পরিমাণ মূল্য কম হয়েছে বলে মনে হবে, সে পরিমাণ মূল্য সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব। ওই পশুর যে পরিমাণ গোশ্ত নিজে অথবা বন্ধু-বান্ধবদের যে পরিমাণ গোশ্ত খাইয়েছে ওই পরিমাণ গোশ্তের মূল্য সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব।
মাসআলা
কোরবানীর ৩ দিনের মধ্যে অর্থাৎ যিলহজ্বের ১০-১২তারিখের মধ্যে কোরবানীর পশুর দাম সাদক্বা করে দেয়া হলে, কোরবানীর ওয়াজিব আদায় হবে না এবং সব সময় গুনাহগার থেকে যাবে। কেননা কোরবানী তেমনই একটি ইবাদত, যেমন-নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত। যেভাবে নামায দ্বারা যাকাতের ফরজ আদায় হয় না, সেভাবে সাদক্বা দ্বারা কোরবানীও আদায় হয় না।
মাসআলা
কোরবানীর দিনসমূহের মধ্যে কোরবানীর নিয়তে মোরগ-মুরগী ইত্যাদি যবেহ করা মাকরূহ।-(আলমগীরী -৪:১০৫)
মাসআলা
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর মৃত উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানী করেছেন। তাই সম্ভব হলে হুযূর করীমের জন্য কোরবানী করা সৌভাগ্যের কারণ হবে। -(বাহারে শরীয়ত)
গরু বা উট দ্বারা কোরবানী করলে নফল হিসেবে একভাগ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্য কোরবানী দেয়া অনেক উত্তম।
গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি চতুষ্পদ হালাল গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানী করা জায়েয। অংশীদারিত্বে কোরবানীর নিয়ম গরু, মহিষ ও উট এ তিন প্রকার পশুর প্রত্যেকটিতে এক হতে সাতজনের নামে কোরবানী করা যায়। তবে শর্ত হল সব ক’টি অংশ শুধুমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে হতে হবে; নিছক মাংস খাওয়ার খেয়ালও থাকতে পারবে না। এক পশুতে কয়েকজন শরীক থাকলে, গোশ্ত পাল্লা দিয়ে ওজন করে সমপরিমাণে ভাগ করে নিতে হবে। কোন শরীকদার বেশী পেয়ে থাকলে অন্যরা মাফ করে দিলেও কারো কোরবানী বৈধ হবে না।সম্মিলিত কোরবানীর পশু ক্রয় করার পর তাতে ভাগ বা অংশ অবশিষ্ট থাকলে অন্য লোককে শামিল করতে কোন অসুবিধা নেই। কেউ একা কোরবানী করার মানসে পশু ক্রয় করলেও তাতে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে ক্রয় করার পূর্বে ভাগগুলো ঠিক করে নেয়া উত্তম; অন্যথায় মাকরূহ।
কোরবানীর পশুর বয়স
কোরবানীর ছাগল কমপক্ষে ১ বছর, গরু ২ বছর এবং উট ৫ বছর বয়সের হতে হবে। কোরবানীর জন্য সুন্দর ও নিখুঁত জন্তু বাছাই করা উত্তম। যেসব জন্তু অন্ধ ও এমন খোঁড়া যে, যবেহ করার স্থানে যেতে অক্ষম, শিং ভাঙ্গা, লেজ এবং কান কাটা বা দুর্বল ইত্যাদি পশু কোরবানীর উপযুক্ত নয়।
কুরবানীর পশুযবেহ করিবার নিয়ম
যবেহ করার নিয়ম জানা থাকলে কোরবানীর পশু নিজহাতে যবেহ করা মুস্তাহাব। যদি নিজে করতে না পারে, তাহলে অন্যের মাধ্যমেও তা সমাধা করা যাবে। তবে যবেহ্’র সময় নিজে সামনে থাকা উত্তম। যবেহ্’র সময় নিম্নের রগসমূহ কাটার ব্যাপারে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। (ক) শ্বাসনালী (খ) খাদ্যনালী (গ) এবং রক্ত চলাচলের রগদু’টি। বক্ষস্থল হতে গলদেশের মধ্যবর্তী কোন স্থানে জবেহ করা বাঞ্ছনীয়। যবেহ’র পূর্বে ছুরি খুব ধারালো করে নিতে হবে। তারপর কোরবানীর জানোয়ারের মাথা দক্ষিণে এবং পিছনের দিক উত্তর দিকে রেখে ক্বেবলামুখী করে শায়িত করে নিম্নলিখিত দু‘আ পড়তে হবে। দু‘আ
ইন্নী ওয়াজ্জাহ্ তু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াতী ওয়াল আরদ্বা হানীফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন, ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্য়ায়া ওয়া মামাতী লিল­াহি রব্বিল আলামীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর
বলে কোরবানীর পশু যবেহ করার পর পাঠ করবেন-
আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নী(অংশীদার থাকলে-‘ওয়া মিন’ বলার পর প্রত্যেকের নাম ও বাপের নাম) কামা তাকাব্বালতা মিন খলীলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিস্ সালাম ওয়া হাবীবিকা মুহাম্মাদিনিল মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এ দোয়া জানা না থাকলে যাদের জন্য কোরবানীর হবে তাদের নামগুলো স্মরণ করে মনে মনে নিয়ত করে নিয়ে কোরবানী করলেও দুরস্ত হবে।কোরবানীর গোশ্ত ৩ ভাগে ভাগ করে এর ১ ভাগ গরীব ও ইয়াতীম-মিসকীনদের দানকরা, ১ ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে দেয়া এবং অন্য ভাগ নিজে রাখা মুস্তাহাব। কোরবানীর পশু যবেহকারী ও গোশ্ত প্রস্তুতকারীকে কোরবানীর পশুর গোশ্ত থেকে পারিশ্রমিক স্বরূপ দেয়া যাবে না।
কুরবানীর পশুর চামড়া, , রশি ও ফুলের মালা প্রভৃতি সদকা করে দিতে হবে। চামড়া সাদক্বা না করে নিজেও ব্যবহার করতে পারবে; যেমন-জায়নামায, বিছানা ইত্যাদি বানাতে পারবে। কিন্তু কোরবানীর চামড়া বিক্রি করে এর মূল্য নিজ কর্মে ব্যয় করতে পারবে না। এ টাকা গরীব মিসকীনদের মাঝে সাদক্বা করে দেয়া ওয়াজিব। চামড়া দ্বীনী-সুন্নী মাদ্রাসায়ও সাদক্বা করে দেয়া যায়, যদি উক্ত মাদ্রাসায় লিল্লাহ্‌ ফান্ড বা মিসকীন ফান্ড থাকে। কোরবানীর পশুর পেটে জীবিত বাচ্চা হলে সেটিকেও যবেহ করে দিতে হবে। তখন সেটার গোশ্তও আহার করা যাবে। যদি মৃত হয় তাহলে ফেলে দিতে হবে। কোরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয় করা পশু কোরবানীর পূর্বে বাচ্চা দিলে সেই বাচ্চাকেও যবেহ করে দিতে হবে। অথবা বাচ্চা বিক্রি করে টাকাগুলো সাদক্বা করে দিতে হবে। বাচ্চা যদি কোরবানীর দিনসমূহে যবেহ করা না হয়, তাহলে সাদক্বা করে দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here