বিষয়- সাদকায়ে ফেৎরার মাসয়ালা

0
111
views

ঈদের দিন সুব্‌হে সাদেকের সময় যে ব্যক্তি হাজাতে আসলিয়া অর্থাৎ, জীবিকা নিরবাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরন (যথা পরিধানের বস্ত্র, শয়নের গৃহ এবং আহারের খাদ্য-দ্রব্য ) ব্যাতীত ৭।।সাড়ে সাত তোলা সোনা, অথবা ৫২,।। ( সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, অথবা এই মূল্যের অন্য কোন মালের মালিক থাকিবে , তাহার উপর ফেৎরা দেওয়া ওয়াজিব হইবে । সে মাল তেজারত বা ব্যবসায়ের জন্য হউক, বা সে মালের বৎসর অতিবাহিত হউক বা না হউক।ফেৎরাকে “সদক্কায়ে ফেৎর” বলে । জীবিকা নির্বাহের আবস্যকিয় উপকরণসমূহকে “হাওয়াযেজে আসলিয়া” বলে। ২০০ দেরহাম পরিমান সম্পত্তির অধিক্কারীকে মালেকে নেসাব বলে। আমাদের দেশি হিসাবে ২০০ দেরহামে ৫২।।সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা হয়।)

মাসআলাঃ
কাহারও বসবাসের অনেক বড় ঘর আছে , বিক্রয় করিলে হাজার পাঁচশ টাকা দাম হইবে । পরিধানে দামী দামী কাপড় আছে , কিন্তু ইহা জরিদার নহে, ২/৪ জন খেদমতগারও আছে, হাজার পাঁচ শত টাকার প্রয়োজনীয় মাল আসবাব আছে; কিন্তু অলঙ্কার নহে । এই সমস্তই কাজে ব্যবহৃত হয়, কিংবা কিছু মালপত্র প্রয়োজন অপেক্ষা বেশী আছে এবং জরী, অলঙ্কারও আছে, কিন্তু যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরিমাণ নহে, এমন লোকের উপর ছদ্‌কায়ে ফেৎর ওয়াজিব নহে ।

মাসআলাঃ
যদি কেহ মাত্র দুইখানা বাড়ীর মালিক হয়, এক বাড়ীতে নিজে বিবি বাচ্চা নিয়ে থাকে, অন্য বাড়ী খানা খালি পড়িয়া থাকে, অথবা ভাড়া দেওয়া হয়, তবে দ্বিতীয় বাড়ীখানাকে বাড়ীখানাকে হাওয়াযেজে আসলিয়ার মধ্য গন্য করা যাইবে না, অতিরিক্ত বলা হইবে । কাজেই দেখিতে হইবে, যদি বাড়ীখানার মুল্য ৫২।।০ (সাড়ে বায়ন্ন) তোলা রুপার মূল্যের সমান বা তার চেয়ে বেশী হয়, তবে তাহার উপর ছত্‌কায়ে ফেৎর ওয়াজিব হইবে, এমন লোককে যাকাত দেয়া জায়েয নাই । কিন্তু যদি এই বাড়ীখানার উপরই তাহার জীবিকা নির্বাহ নির্ভর করে, তবে বাড়ীখানাকে হাওয়ায়েজে আসলিয়ার মধ্যে গন্য করিতে হইবে এবং তাহার উপর সদ্‌কায়ে ফেৎর সদ্‌কায়ে ফেৎর ওয়াজিব হইবে না । এমন ব্যক্তি সদ্‌কায়ে ফেৎর লইতে পারে এবং তাহাকে দেওয়াও জায়েয আছে। সারকথা- যে ব্যক্তি যাকাত, সদ্‌ক্কার পয়সা লইতে পারে, তাহার উপর সদ্‌কায়ে ফেৎর ওয়াজিব নহে; যাহার ছদ্‌কায়ে যাকাত লওয়া দুরুস্ত নাই ইয়াহার উপর ওয়াজিব । (এইরূপ কেহ যদি ৭ বিঘা জমির মালিক হয় এবং ৬ বিঘা জমির ফসলে তাহার জীবিকা নির্বাহ হইয়া যায়, আর এক বিঘা জমি অতরিক্ত, ইহার মুল্য ৫২।।০ (সাড়ে বায়ন্ন) তোলা রুপার মূল্যের সমান বা তার বেশী হয়, তাহার উপর সদকায়ে ফেৎর ওয়াজিব হইবে ।)

( মাসআলাঃ মেয়েলোকের জেওর হাওয়ায়েজে আসলিয়ার মধ্য গন্য নহে । কাজেই যে মেয়েলোকের নিকট ৫২।।(সাড়ে বায়ান্ন) তলা রুপা বা সমমুল্যের জেওর থাকিবে তাহার উপর ফেৎরা ওয়াজিব হইবে ।(‘সুক্ষ হিসাবে যাহাদের ওপর ফেৎরা ওয়াজিব [বাধ্যতামুলক] হয় না অথচ দেওয়ার সঙ্গতি আছে, তাহারা যদি নিজ খুশিতে ছদ্‌কা দান করে , তবে তাহাও মুস্তাহাব হইবে এবং তাহারা অনেক বেশী সয়াওব পাইবে। কারন, হাদিস শরীফে আছে, গরিব হওয়া স্বত্বেও কষ্ট করিয়া যে আল্লাহর রাস্তায় সদ্‌ক্কা দেয় তাহার দানকে আল্লাহ্‌ তা’আলা অনেক বেশী পছন্দ করেন’।))

মাসআলাঃ
যদি কেহ করযদার (ঋণগ্রস্ত) থাকে , তবে ঋণ বাদে যদি মালেকে নেসাব হয়, তবে ফেৎরা ওয়াজিব হইবে, নতুবা নয় ।

মাসআলাঃ
ঈদের দিন যে সময় সব্‌হে সাদেক হয়, সেই সময় সদ্‌ক্কায়ে ফেৎর ওয়াজিব হয়। কাজেই কেউ যদি সুব্‌হে সাদেকের আগে মারা যায়, তবে তাহার উপর ফেৎর ওয়াজিব হইবে না, তাহার সম্পত্তি হইতে দিতে হইবে না এবং মালেকে নেসাবের যে সন্তান সুব্‌হে সাদেকের পূর্বে জন্মিবে তাহার ফেৎরা দিতে হইবে। যে সুব্‌হে সাদেকের পরে জন্মিবে তাহার দিতে হইবে না। (এইরূপে কেহ যদি ছোব্‌হে সাদেকের পর নও মুসলমান হয়, তবে তাহার উপরও ফেৎরা ওয়াজিব হইবে না।)

মাসআলাঃ
ঈদের নামাযের পূর্বেই সদ্‌ক্কায়ে ফেৎর দিয়া পরিষ্কার হওয়া মুস্তাহাব। যদি একান্ত আগে দিতে না পারে , তবে পরেই দিবে । পরে দিলেও আদায় হইবে ।

মাসআলাঃ
কেহ যদি ঈদের দিনের পূর্বেই রমযানের মধ্যে ফেৎরা দিয়া দেয় তাহাও দুরুস্ত আছে, ঈদের দিন পুনরায় দিতে হইবে না। যদি কেহ ঈদের দিন ফেৎরা না দেয়, তবে তাহার ফেৎরা মাফ হইয়া যাইবে না, অন্য সময় দিতে হইবে ।

( মাসআলাঃ মালেকে নেসাব পুরুষের একটি সাবালগ সন্তান যদি পাগল হয়, তবে তাহার পক্ষ হইতে ফেৎরা দেওয়া পিতার উপর ওয়াজিব।)

( মাসআলাঃ এতিম সন্তান যদি মালেকে নেসাব হয়, তবে তাদেরও ফেৎরা দিতে হইবে ।)

মাসআলাঃ
মেয়েলোকের শুধু নিজের ফেৎরা দেওয়া ওয়াজিব । স্বামী, সন্তান, মা, বাপ বা অন্য কাহারও পক্ষ হইতে ওয়াজিব নহে।( কিন্তু পুরুষের নিজেরও দিতে হইবে এবং নিজের ছেলেমেয়েদের পক্ষ হইতেও দিতে হইবে। সন্তান না-বালেগ হইলে তাহাদের ফেৎরা দেওয়া পিতার উপর ওয়াজিব। আর বালেগ হইলে এবং এক পরিবারভুক্ত থাকিলে তাহাদের ফেৎরা, স্ত্রীর ফেৎরা এবং মা বাপ থাকিলে তাহাঁদের ফেৎরা দেওয়া মুস্তাহাব। )
মাসআলাঃ
না-বালেগ সন্তানের নিজের মাল থাকিলে যে প্রকারেই মালিক হউক না কেন , ওয়ারিশ সুত্রে বা অন্য প্রকারে হউক, তাহাদের মাল হইতে দিতে হইবে। ( এবং মাল না থাকিলে পিতাকে নিজের মাল হইতে দিতে হইবে।) যদি ঐ শিশু ঈদের দিন সুব্‌হে সাদেক হওয়ার পর পয়দা হয়, তবে তাহার পক্ষ হইতে ফেৎরা দ্দেওয়া ওয়াজিব হইবে না।

মাসআলাঃ
(ফেৎরার সঙ্গে রোযার কোন সংশ্রব নাই । এই দুইটি পৃথক পৃথক ইবাদত। অবশ্য এই ইবাদতের তাকীদ হয় । অতএব, ) যাহারা কোন কারনে রোযা না রাখে, ফেৎরা তাহাদের উপরও ওয়াজিব। আর যাহারা রাখে তাহাদের ওপরও ওয়াজিব। উভয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই ।

মাসআলাঃ
ফেৎরা যদি গম বা গমের আটা বা গমের ছাতু দ্বারা আদায় করিতে চায়, তবে আধা ছা’ অর্থাৎ ৮০ তোলার সেরে এক সের সাড়ে বার ছটাক দিতে হইবে । কিন্তু পূর্ণ দুই সের দিয়া দেওয়াই উত্তম । কেননা, বেশী দিলে কোন ক্ষতি নাই; বরং বেশী সওয়াব পাওয়া যাইবে । পক্ষান্তরে কম হইলে ফেৎরা আদায় হইবে না । আর যব বা যবের ছাতু দ্বারা ফেৎরা আদায় করিতে চাহিলে পূর্ণ এক ছা’ অর্থাৎ, তিন সের নয় ছটাক দিতে হইবে । পূর্ণ চারি সের দেওয়াই উত্তম।

মাসআলাঃ
যদি গম এবং যব ব্যতীত অন্য কোন শস্য যেমন- ধান, চাউল, বুট, কলাই ইত্যাদি দ্বারা ফেৎরা আদায় করিতে চায়, তবে বাজার দরে উপরোক্ত পরিমাণ গম বা যবের যে মুল্য হয়, সেই মূল্যের চাউল, ধান, বুট ইত্যাদি দিলে আদায় হইয়া যাইবে । ( মুল্য হিসাব না করিয়া আন্দাজি দুই সের চাউল বা ধান দিলে যদি চাউলের মুল্য কম হয়, তবে ওয়াজিব আদায় হইবে না । ইহাই আমাদের হানাফী মযহাবের ফতওয়া। শাফেয়ী মযহাবে মুল্য না দিয়া চাউল দিলেও ওয়াজিব আদায় হইবে বটে; কিন্তু পূর্ণ চারি সের চাউল দিতে হইবে ।)

মাসআলাঃ
যদি গম বা যব না দিয়া , উপরোক্ত পরিমাণ গম বা যবের মুল্য নগদ পয়সা দিয়া দেয় , তবে তাহা সবচেয়ে উত্তম।

মাসআলাঃ
একজনের ফেৎরা একজনকে দেওয়া বা একজনের ফেৎরা কয়েকজনকে ভাগ করিয়া দেওয়া উভয়ই জায়েয আছে ।

মাসআলাঃ
যদি কয়েকজনের ফেৎরা একজনকে দেওয়া হয়, তাহাও দুরুস্ত আছে, ( কিন্তু তদ্দারা মিসকীন যেন মালেকে নেসাব না হইয়া যায়।)

মাসআলাঃ
যাহার জন্য যাকাত খাওয়া হালাল, তাহার জন্য ফেৎরা খাওয়াও হালাল।

মাসআলাঃ
ফেৎরা কাহাকে দিতে হইবে ? উত্তরঃ আত্মীয়, স্বজন, প্রতিবেশী এবং পার্শ্ববর্তী লোকদের মধ্যে যাহারা গরীব দুঃখি আছে তাহাদিগকে দিতে হইবে । সাইয়্যেদকে, মালদারকে , মালদারের না-বালেগ সন্তানকে এবং নিজের মা, বাপ, দাদা, নানা, নানী বা নিজের ছেলে, মেয়ে, নাতি,নাতনী ইত্যাদিকে ফেৎরা, যাকাত দেওয়া জায়েয নহে। অবশ্য সাইয়্যেদ বা মা, বাপ, দাদা, নানা, নানী বা ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনী যদি গরীব হয়, তবে তাহাদিগকে হাদিয়া-তোহ্‌ফা স্বরূপ পৃথকভাবে দান করিয়া সাহায্য করিতে হইবে।

মাসআলাঃ
মসজিদের ইমাম, মোয়ায্‌যিন বা তারাবীহ্‌র ইমাম গরীব হইলে তাহাদিগকেও ফেৎরা দেওয়া দুরুস্ত আছে, কিন্তু নেছাব পরিমাণ দেওয়া যাইবে না এবং বেতন স্বরূপও দেওয়া যাইবে না। বেতন স্বরূপ দিলে ফেৎরা আদায় হইবে না ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here