বিষয়- হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কূফা গমন:

0
23
views

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কূফা গমন:
কূফাবাসীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের চিঠি লিখার পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু চিন্তা করলেন যে, সেখানে তিনি যাবেন কি না। তিনি অনেকের সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রথমে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা যাচাই করে দেখবেন যে, ওরা বাস্তবিকই উনাকে চায় কি না? উনার প্রতি সত্যিই আন্তরিক মুহব্বত ও বিশ্বাস আছে কি না? সঠিক সংবাদ পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন, তিনি যাবেন কি যাবেন না।
অতঃপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে এ কাজের জন্য মনোনীত করলেন এবং ফরমালেন, প্রিয় মুসলিম! কূফা থেকে যেভাবে চিঠি আসছে তা যাচাই করে দেখার জন্য তোমাকে আমার প্রতিনিধি করে সেখানে পাঠানোর মনস্থ করেছি। তুমি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা উপলব্ধি এবং যাচাই করে যদি অবস্থা বাস্তবিকই সন্তোষজনক মনে কর, তাহলে আমার কাছে চিঠি লিখবে। চিঠি পাওয়ার পর আমি রওয়ানা হবো, অন্যথায় তুমি সেখান থেকে চলে আসবে। তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম কূফাবাসীদের কাছে একটি চিঠি লিখলেন- ‘ওহে কূফাবাসী! পরপর তোমাদের অনেক চিঠি আমার কাছে পৌঁছেছে। তাই আমি আমার চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আমার প্রতিনিধি করে তোমাদের কাছে পাঠালাম। তোমরা সবাই তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাঁর খিদমত করো। তিনি তোমাদের মনোভাব যাচাই করে আমার কাছে চিঠি লিখবেন, যদি তোমাদের মনোভাব সন্তোষজনক হয়, তাঁর চিঠি আসার পর পরই আমিও তোমাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যাব।’ এভাবে চিঠি লিখে সীল মোহর লাগিয়ে হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিলেন এবং উনাকে বিদায় দিলেন। হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দুই ছেলে হযরত মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত ইব্রাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহিও তৈরি হয়ে গেলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, আব্বাজান! আমাদেরকে ফেলে যাবেন না, আমাদেরকেও সাথে নিয়ে যান। হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ছেলেদের অন্তরে আঘাত দিতে চাইলেন না। তাই তাঁর ছেলেদ্বয়কেও সাথে নিয়ে নিলেন।
অতঃপর তিনি মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ গেলেন এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করার পর কূফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি প্রাণঢালা সংবর্ধনা: ✔
.
কূফায় পৌঁছে মুখতার বিন উবায়দুল্লাহ সাক্ফী, যে আমন্ত্রণকারীদের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিল ও আহলে বাইত-এর অনুরক্ত ছিল, তার ঘরেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাশরীফ রাখলেন। যখন কূফাবাসীরা খবর পেল যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। তখন কূফাবাসীরা দলে দলে এসে তাঁর হাতে বাইয়াত হতে লাগলো। অল্প দিনের মধ্যে চল্লিশ হাজার লোক তাঁর হাতে বাইয়াত হয়ে গেল এবং এমন ভালবাসা ও মুহব্বত দেখালো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁর পিছে পিছে লোক চলাফেরা করছে, দিন-রাত মেহমানদারী করছে, তাঁর হাতে-পায়ে চুম্বন করছে এবং একান্ত আনুগত্যের পরিচয় দিচ্ছে। এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হলেন এবং মনে মনে বললেন, এরাতো সত্যিই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড়ই আশিক এবং উনার জন্য একেবারে ফানা। তিনি ভাবলেন, আমাকে পেয়ে তাদের যে অবস্থা হয়েছে, জানিনা, হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আসলে তারা কী যে অবস্থা করবে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে সমস্ত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কাছে চিঠি লিখলেন- “চল্লিশ হাজার লোক আমার কাছে বাইয়াত হয়েছে, সব সময় আমার সাথে সাথে রয়েছে, আমার যথেষ্ট খিদমত করছে এবং তাদের অন্তরে আপনার প্রতি অসীম মুহব্বত রয়েছে। তাই আপনি আমার চিঠি পাওয়া মাত্রই চলে আসুন। এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক।” এভাবে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নিকট চিঠি লিখলেন। এদিকে পত্র-বাহক পত্র নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। আর ঐদিকে দেখুন, তক্দীরে যা লিখা ছিল, তা কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে.
.
কিন্তু ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অস্বীকারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দিলেন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শত কষ্ট-যাতনা ভোগ করতে পারেন, অনেক বিপদ-আপদের মুকাবিলা করতে পারেন, এমন কী আপন পরিজনের সমস্ত লোকদের নির্দয়ভাবে শহীদ হওয়াটা অবলোকন করতে পারেন; নিজেও জালিমদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করতে পারেন, কিন্তু ইসলামের নিযাম বা বিধান ছত্রভঙ্গ হওয়া কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। নিজের নানাজান হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বীন ধ্বংস হওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের কাজ ও কর্মপন্থা দ্বারা তা প্রমাণ করেছেন এবং দুনিয়াবাসীকে এটা দেখিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালার মনোনীত ও খাছ বান্দাগণের এটাই শান যে, বাতিলের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং তীর তলোয়ারের সামনে বুক পেতে দেন, কিন্তু কখনও বাতিলের সামনে মাথা নত করেন না। হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের আমল দ্বারা তাঁর উচ্চ মর্যাদার পরিচয় দান করেছেন এবং জনগণের সামনে নিজের পদমর্যাদা তুলে ধরেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here