হযরত আলী আসগর রাদ্বীয়াল্লাহু আনহু-এর শাহাদাতঃ

0
22
views

হযরত আলী আসগর রাদ্বীয়াল্লাহু আনহু-এর শাহাদাতঃ

হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম ভাতিজা হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোর নয়নে কাঁদছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বোনের হাত ধরে তাঁবুর অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘বোন! সুবুর করো, আল্লাহ তায়ালা সুবুরকারীদের সাথে আছেন। সুবুর এবং ধৈর্যের আঁচল হাতছাড়া করো না। যা কিছু হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে হচ্ছে। আমাদের সুবুর ও ধৈর্যের মাধ্যমে কামিয়াবী হাসিল করতে হবে। এটা আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা।’

বোনকে নিয়ে যখন তাঁবুর অভ্যন্তরে গেলেন, তখন হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে এসে বললেন, আপনার ছেলে আলী আসগার পানির তৃষ্ণায় কেমন যেন করছে, গিয়ে দেখুন। পানির তৃষ্ণায় তাঁর অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গেছে। কোন রকম নড়াচড়া করতে পারছে না। কাঁদছেন কিন্তু চোখে পানি আসছে না। মুখ হা করে আছেন, কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেছে। শুনুন, যালিমেরা হয়তো জানে না যে, আমাদের সাথে ছোট ছোট শিশুরাও রয়েছেন। আমার মনে হয়, এ ছোট শিশুকে কোলে করে আপনি ওদের সামনে নিয়ে গেলে নিশ্চয় ওদের দিলে রহম হতে পারে। কারণ এ রকম শিশু ওদের ঘরেও রয়েছে। তাই আপনি এ শিশুকে কোলে করে ওদের সামনে নিয়ে যান এবং বলুন, আমাকে পানি দিও না, তোমাদের হাতে কয়েক ফোঁটা পানি এ শিশুর মুখে দাও। তাহলে তারা নিশ্চয় দিবে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ‘শহরবানু! তোমার যদি এটা আরজু এবং ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে তোমার এ ইচ্ছা পূর্ণ করতে আমি রাজি আছি। কিন্তু ঐ বদবখ্তদের প্রতি আমার আদৌ আস্থা নেই।’

যা হোক, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোলে নিয়ে ইয়াযীদ বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, ‘দেখ! ইনি ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু। ইনি আমার ছেলে আলী আসগার। ইনি তোমাদের সেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর, তোমরা যার কলিমা পাঠ করো। শোন! আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করে থাকলে, আমার থেকে তোমরা এর বদলা নেবে। কিন্তু এ মাসুম শিশুতো তোমাদের কোন ক্ষতি করেননি। ইনি পানির তৃষ্ণায় ছটফট করছেন, কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না। শোন! আমার হাতে কোন পানির পেয়ালা দিও না, তোমাদের হাতে এ শিশুর মুখে কয়েক ফোঁটা পানি দাও। আর এ শিশু পানি পান করার পর তৃষ্ণা মিটে গেলে তলোয়ার হাতে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। তাই উনার তৃষ্ণাটা নিবারণ করো। তাঁবুর পর্দানশীন মহিলাদের কাকুতি-মিনতিতে টিকতে না পেরে আমি একে নিয়ে এসেছি। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এ করুণ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, আর এদিকে আলী আসগর আলাইহিস সালাম আলাইহিকে লক্ষ্য করে ‘হরমিলা বিন্্ কাহিল’ নামক এক বদবখ্্ত যালিম তীর নিক্ষেপ করলো এবং সেই তীর এসে আলী আসগার আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর গলায় বিধল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দেখলেন, শিশুটি একটু গা-নাড়া দিয়ে চিরদিনের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলেন, বলতে লাগলেন, ‘ওহে যালিমেরা! তোমরাতো তোমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিও কোন সমীহ করলে না। তোমাদের মনতো কাফিরদের থেকেও কঠোর। শিশুদের প্রতি কাফিরেরাও সহানুভূতি দেখায়। তোমরাতো নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করো। এসব কথা বলে তিনি ছেলের গলা থেকে তীর বের করলেন এবং নিথর দেহ মুবারক মাটিতে রেখে বললেন, মাওলা! এ লোকেরা যা কিছু করছে, এর জন্য আমি আপনাকে সাক্ষ্য করছি। দেহ মুবারক কাঁধে করে তাঁবুর কাছে নিয়ে এসে হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার পাশে রেখে ডাক দিয়ে বললেন, ‘ওহে শহরবানু! ওহে যয়নাব! আলী আসগার আর ছটফট করবেন না এবং তৃষ্ণার কারণে হাত পা নড়াচড়া করবেন না। উনার তৃষ্ণার্ত অবস্থা থেকে তোমাদের অস্থিরতা আর বৃদ্ধি পাবে না। সে জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে উনার দাদীজান আলাইহাস সালাম উনার কোলে বসে হাউজে কাওষারের পানি পান করছেন।
হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জিহাদের ময়দানে গমনঃ

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তাঁবুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর চৌদ্দ বছর বয়স্ক ছেলে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলী আওসাত আলাইহিস সালাম, যিনি মারাত্মক রোগ ও জ্বরে ভুগছিলেন, হেলিয়ে দুলিয়ে কোন মতে আব্বাজানের সামনে এসে আরজ করলেন, আব্বাজান! আমাকেও বিদায় দিন, আমিও শাহাদাত বরণ করতে চাই। তিনি নিজের অসুস্থ ছেলেকে সান্ত¡না দিলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, যাইনুল আবিদীন! তোমাকেও যদি বিদায় দিই, তাহলে ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ‘সিলসিলা’ কার থেকে জারি হবে? বাবা শোন! তোমার থেকেই আমার বংশের ‘সিলসিলা’ জারি হবে। আমি দুআ করছি, আল্লাহ পাক তোমাকে জীবিত রাখুন এবং তোমার থেকে আমার বংশধরের ‘সিলসিলা’ জারি রাখুন। তিনি উনাকে বাতিনী খিলাফত ও ইমামত প্রদান করলেন। উনাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে বাতিনী নিয়ামত প্রদান করলেন এবং কিছু ওছীয়ত করার পর ফরমালেন, প্রিয় বৎস! আমি চলে যাওয়ার পর মদীনা শরীফ-এ পৌঁছার যদি সৌভাগ্য হয়, তাহলে সবার আগে তোমার নানাজান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ-এ গিয়ে সর্বপ্রথম আমার সালাম বলবে এবং কারবালায় তোমার দেখা সমস্ত ঘটনা উনাকে শুনাবে।

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, দেখ, আমি কে? আমি হলাম জান্নাতের যুবকদের সাইয়্যিদ। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁকে রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুমু দিতেন এবং বলতেন, এটা আমার ফুল। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁর মা সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁর পিতা হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যিনি খাইবর বিজয়ী। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যখন আল্লাহ পাক উনার নবী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদারত অবস্থায় থাকতেন, আমি উনার পিঠ মুবারকের উপর সওয়ার হয়ে যেতাম আর তখন উনি সিজদাকে দীর্ঘায়িত করতেন। ওহে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ঘরকে উচ্ছেদকারীরা! ওহে হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার বাগানের ফুলকে ছিঁড়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে কারবালার উত্তপ্ত বালিতে নিক্ষেপকারীরা! এসো, আমার রক্তের দ্বারাও তোমাদের হাতকে রঞ্জিত করো। আমার পিছনে আর কেউ নেই। একমাত্র আমিই রয়েছি। এগিয়ে এসো। তখন ওরা তলোয়ার খাপ থেকে বের করে তীর উত্তোলন করে এগিয়ে আসলো। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন খাপ থেকে তলোয়ার বের করে ওদের উপর আক্রমণ করলেন, তখন ওরা মেষের মত ছুটে পালাতে লাগলো। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার তলোয়ার বিদ্যুৎ বেগে ওদের উপর চলতে শুরু করলো এবং ওদের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে এমনভাবে পতিত হতে লাগলো যেমন শীতকালে বৃক্ষের পাতা ঝরে পড়ে। শেরে খোদার আওলাদ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম লাশের স্তূপ করে ফেললেন। তিনি নিজে তীরের আঘাতে জর্জরিত এবং তিনদিনের তৃষ্ণায় কাতর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর তলোয়ার ‘যুলফিকার’ তখনও সেই নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছিল, যেভাবে বদরের যুদ্ধে দেখিয়েছিল। বদরের যুদ্ধে এ তলোয়ার যখন শেরে খোদা হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাতে ছিল এবং চালানো হচ্ছিল, তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ আসছিল- ‘লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফা ইল্লা যুল্ফিকার’ অর্থাৎ ‘ হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মত যেমন কোন জওয়ান নেই, তেমনি ‘যুলফিকার-এর মত কোন তলোয়ার নেই।’ বদর যুদ্ধের ন্যায় কারবালার ময়দানেও সেই তলোয়ার নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছিল।

মোট কথা, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম লাশের স্তুপ করে ফেললেন। ইয়াযীদী বাহিনীকে কেটে কেটে মাটি রঞ্জিত করে ফেললেন। একদিকে তিনি যেমন অনেক ইয়াযীদী সৈন্যকে কচুকাটা করে ছিলেন অন্যদিকে ওরাও উনাকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে ফেললো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here